ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর পুনর্গঠন ও মেরামতের কাজে ইরানেরই সম্পদ ব্যবহার করার কথা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছেন। একই সময়ে কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পর ইরান আরও ড্রোন উৎক্ষেপণ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সূত্রটি জানান, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট তার অধীনস্থ একটি দলকে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইরানের কারণে নতুন কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ঘটলে তা মেরামতের ক্ষেত্রেও ইরানি সম্পদ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
একদিন আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই মার্কিন সিএনএন’কে বলেছেন, তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করতে হবে। শনিবার সূত্রটি স্পষ্ট করে বলেননি যে, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ঠিক কোন ধরনের সম্পদ পরীক্ষা করছে। তবে ব্যবহৃত ভাষা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বিষয়টি কেবল জব্দকৃত সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি সম্পদ পুনঃনির্দেশনার এই হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নাজুক যুদ্ধবিরতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ সপ্তাহান্তেও উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা হয়েছে। শান্তি আলোচনা বর্তমানে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একজন মন্ত্রী শনিবার তেহরানে গিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির কাছে একটি চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন বলে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ জানিয়েছে।
শনিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির মধ্যে অবস্থিত গোরুক এবং কেশম দ্বীপের ইরানি উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় হামলা চালায়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ইরান থেকে উৎক্ষেপিত কয়েকটি ড্রোন সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল এবং সেগুলো ভূপাতিত করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা আরও দুটি ইরানি আক্রমণাত্মক ড্রোনও গুলি করে ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী বলেছে, তারা সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এগুলো আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। এতে কিছু বস্তুগত ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বাহরাইনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়। কুয়েত ও বাহরাইন উভয় দেশই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
পাকিস্তানি মন্ত্রীর তেহরান সফর
পরে ইরান দাবি করে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং সপ্তমটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি। তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির লক্ষ্যে মূলত পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই চুক্তি হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেয়া হবে। কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে মাঝেমধ্যেই সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় কোনো সমঝোতা এখনো সম্ভব হয়নি। তেহরান চাইছে তাদের তেল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয়ের ওপর প্রবেশাধিকার, অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার শিথিলতা, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। কিন্তু বর্তমানে ইরান কার্যত ওই রুট অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি শনিবার তেহরানে পৌঁছেছেন এবং তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আইএসএনএ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাকভি তার দেশের সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রেরিত একটি বিশেষ চিঠি খামেনির কাছে পৌঁছে দেবেন।
ট্রাম্পের ওপর চাপ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি মূল্যের কারণে রাজনৈতিক চাপের মুখে। ফলে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য তার ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনবিসি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করা হলেও দেশটির হাতে এখনো প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ক্ষেপণাস্ত্র রয়ে গেছে। ট্রাম্প বলেন, তাদের এখনও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। শতাংশের হিসেবে বললে, তাদের হাতে হয়তো ২১ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে। সংখ্যাটি এখনো অনেক, কিন্তু আমরা প্রথম হামলা চালানোর সময় যত ছিল, এখন আর তত নেই। এই সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
লেবাননেও উত্তেজনা
সমান্তরালভাবে লেবাননে চলমান সংঘাতে দক্ষিণ লেবাননে একটি সামরিক যানবাহনে ইসরাইলি হামলায় দুই সেনা কর্মকর্তা ও এক সৈনিক নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করছে। ইরান জানিয়েছে, লেবাননে ইসরাইল এবং ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি না হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়। লেবাননের সেনাপ্রধান জেনারেল রুডলফ হাইকেল শনিবার পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের আমন্ত্রণে পাকিস্তান সফরে গেছেন বলে দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে। তবে সফরের বিস্তারিত কারণ প্রকাশ করা হয়নি। এই সফর বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ওয়াশিংটন এবং লেবাননের প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ নেতারা বরাবরই বলে আসছেন যে, লেবানন যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনা এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা আলাদা বিষয়।
এদিকে হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এ সপ্তাহে লেবাননের যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ইসরাইল-লেবানন সরকারের প্রস্তাবিত চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, ওই চুক্তিতে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং হিজবুল্লাহও আলোচনার অংশ ছিল না। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান মতবিরোধ সত্ত্বেও তারা লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না এবং সেনা প্রত্যাহারও করবে না।
