বিশ্বের অন্যতম সেরা হওয়ার পরও ন্যায্যমূল্য না থাকায় প্রতি বছর ৩০-৫০ শতাংশ চামড়া ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটে দেশে। অথচ ইউরোপ ও আমেরিকায় চামড়া পণ্য (জুতা, ব্যাগ ইত্যাদি) প্রস্তুত করে রপ্তানির জন্য সেই কাঁচা চামড়াই উচ্চমূল্যে আমদানি করি। তার পরও বছরে চামড়া খাতের রপ্তানি মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে বহুবছর। অথচ, ভিয়েতনামে চামড়া হয় না। তারা অন্য দেশ ২০ বিলিয়ন ডলারের চামড়া আমদানি করে। তার থেকে প্রতি বছর ২৪ বিলিয়ন ডলারের চামড়া পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের থেকেও বেশি মূল্য সংযোজন হতে পারে চামড়া খাতে। এর পরও সরকার সজাগ নয়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে?’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এই খাতের সম্ভাবনা ও বিদ্যমান সংকট নিয়ে আলোচকরা এমন সব তথ্য দেন। এ সময় বক্তারা একাধারে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেন। ওয়েবিনাটির সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ হলেও চামড়া খাতে তা ৯০ শতাংশের বেশি সম্ভব। অথচ, এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের অভাবে আমরা চামড়ার বড় বাজার হারাচ্ছি। যেখানে ২০২৭ সাল থেকে কার্বন ট্যাক্সের মতো কঠোর নিয়ম যুক্ত হবে।
জেনিস সুজের চেয়ারম্যান নাসির খান অভিযোগ করেন, বিগত সরকারই চায়নি এ খাত ঘুরে দাঁড়াক। সরকার সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করলো, কিন্তু যে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা করা হবে, তা ১০ বছরেও করতে পারেনি সরকার। কোনো কোনো কোম্পানি নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করতে চাইলেও হাইকোর্টে দৌড়াতে হয়েছে সাত বছর। এখন সে অনুমতি মিলেছে। এটা সরকারের কারণে হয়েছে।
নাসির খান আরও বলেন, ভিয়েতনামে মাত্র পাঁচটি লাইসেন্স দিয়ে ব্যাবসা করা গেলেও বাংলাদেশে ৩০টি লাইসেন্স লাগে এবং প্রতি বছর সেগুলো নবায়ন করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা চরম হয়রানির শিকার হন। এ কারণে ভিয়েতনামের চামড়ার এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানিকারক কোম্পানি ২০১৭ সালে চামড়া খাতে বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে এসেও বিনিয়োগ না করে ফিরে গেছে। তারা বলেছে- তোমাদের সরকারই চায় না, এখানে ব্যাবসা হোক।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার ও ফুটওয়্যার রপ্তানিকারক সমিতির চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, সাভারে আন্তর্জাতিক মানের পরিবর্তে নিম্নমানের চাইনিজ যন্ত্রপাতি দিয়ে সিইটিপি করায় বড় বায়াররা চলে গেছে। ফলে যে চামড়া আগে আড়াই থেকে তিন ডলারে বিক্রি হতো, এখন তার দাম নেমে এসেছে মাত্র ৪০-৫০ সেন্টে। এ কারণে কোরবানির ঈদের পশুর চামড়ার দাম কমেছে। কোরবানির ঈদের চামড়ার ক্রেতা না পেয়ে নষ্ট হওয়ার জন্য আর্থিক সংকটও বড় কারণ বলে জানান আলোচকরা।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ জানান, ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৪৬০ কোটি টাকা থেকে মাত্র ৬৫ কোটিতে নেমে আসায় ট্যানারি মালিকরা অর্থ সংকটে আছেন। এই অর্থ সংকটের কারণে মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহ করা যাচ্ছে না, ফলে এবারও ৬০ শতাংশ ছাগলের চামড়া নষ্ট হয়েছে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান আগামী এক বছরের মধ্যে এবং আসন্ন কোরবানির ঈদের আগেই নিশ্চিত করতে হবে। তিনি মনে করেন, বুড়িগঙ্গার পর এখন ধলেশ্বরী নদী ধ্বংসের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, চামড়া খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি ব্যাংক পুনরায় অর্থায়ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার মন্ডল আগামী এক বছরের মধ্যে চামড়ার অপচয় অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রযুক্তিগত টার্গেট নেয়ার পরামর্শ দেন।
বক্তাদের পরামর্শ, ঈদে চামড়া নষ্ট হওয়া এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিশ্চিত করতে হলে উচ্চ মূল্যে চামড়া রপ্তানি নিশ্চিত করতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে ইউরোপ ও আমেরিকার চামড়ার বড় ক্রেতাদের বেধে দেয়া পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এ জন্য সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা রাখার আহ্বান তাদের।
