দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রবেশদ্বার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথটি ক্রমাগত আতঙ্কের নৌপথে পরিণত হয়েছে। এই নৌপথে কখনো লঞ্চ ডুবি, কখনো ফেরি ডুবি আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাস ডুবির মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ২০০৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছরে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে বড় ধরনের কয়েকটি নৌ-দুর্ঘটনায় আড়াইশ’র উপরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই অবস্থায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করেছে আতঙ্ক। যার কারণে এই পথ হয়ে যাতায়াতে যাত্রীদের আগ্রহ অনেকাংশেই কমে যাচ্ছে।
একের পর এক লঞ্চ ও ফেরি ডুবির পর সর্বশেষ ফেরিতে উঠতে গিয়ে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে যাত্রীবাহী দু’টি বাস ডুবির ঘটনা দেশব্যাপী আরও বেশি আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠেছে। সবগুলো দুর্ঘটনাকে ঘাট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৫শে মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের যাত্রীবাহী একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গেলে ২৬ জন যাত্রী মারা যান। ওই দুর্ঘটনার তিন মাস যেতে না যেতেই আবারো আরেকটি বাস ডুবির পুনরাবৃত্তি ঘটলো। গতকাল শুক্রবার ফেরিতে ওঠার সময় ফেরির পকেটের রেম্প (ঢালা) ভেঙে বাসটি সরাসরি পদ্মা নদীতে ডুবে নিমজ্জিত হয়।
তবে ফেরিতে উঠার সময় বাসের যাত্রীরা আগেই ঘাটে নেমে গিয়েছিল। যার কারণে এ যাত্রায় প্রাণহানির ঘটনা থেকে রক্ষা পায় কমপক্ষে ৪০ যাত্রী। বাসে থাকা চালক ও তার সহযোগীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। ফেরিতে রেলিং না থাকায় এর আগে গত ২৫শে মার্চ সোহার্দ্য পরিবহনের যাত্রী বোঝাই একটি বাস ফেরিতে ওঠতে গিয়ে নদীতে পড়ে গেলেও এ যাত্রায় ফেরির রাম্প (ঢালা) ভেঙে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। তবে স্থানীয়রা বলছেন- বাসটি ফেরিতে উঠার সময় গতি ছিল অনেক বেশি। যার কারণে ফেরির ডালা ভেঙে সহসাই বাসটি পদ্মায় ডুবে যায় কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা এসবি সুপার ডিলাক্স নামের যাত্রীবাহী বাসটি। এই দুর্ঘটনাতেও তদন্ত কমিটি হবে কিন্তু সেটা শুধুই কাগজে-কলমে। পরবর্তীতে সবকিছুই ঠিক আগের মতোই চলবে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় মানুষজন।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটের পদ্মা নদীতে গত ২১ বছরে লঞ্চ, ফেরি ও যাত্রীবাহী বাস ডুবিসহ ৫টি বড় ধরনের নৌ- দুর্ঘটনায় আড়াইশ’র উপরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নৌ-দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ২৫শে মার্চ দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরিঘাটে সোহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস ফেরিতে উঠতে গিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ফেরিতে রেলিং না থাকা এবং ঘাট অব্যবস্থাপনাকেই তাই দায়ী করেছেন দুর্ঘটনায় নিহত পরিবারের সদস্যসহ যাত্রীরা। ২০০৫ সালের ১৭ই মে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটের শিবালয় উপজেলার আরিচা ঘাট সংলগ্ন অন্বয়পুর এলাকায় প্রায় ২০০ জন যাত্রী নিয়ে কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে এমভি রায়পুরা নামক লঞ্চ যমুনায় নিমজ্জিত হয়ে ১৬০ জনের উপরে যাত্রী প্রাণ হারায়।
এর মধ্যে পুলিশের তালিকায় ১০৯ জন ছিল নিখোঁজ। ৫৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও ২৬ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। লঞ্চ ডুবির ঘটনায় উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম লঞ্চটি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। ২০১৫ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের পাটুরিয়া ঘাটের অদূরে এমভি মোস্তফা লঞ্চ পদ্মায় নিমজ্জিত হয়ে ৭০ জন যাত্রী মারা যান। এরমধ্যে ২৭ জন পুরুষ ও ২৪ জন নারী ও ১১ জন শিশু ছিল। লঞ্চ ডুবির পর ২০২১ সালের ২৭শে অক্টোবর পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় আকস্মিকভাবে ডুবে যায় রো রো ফেরি আমানত শাহ।
দৌলতদিয়া থেকে ১৭টি পণ্য বোঝাই ট্রাক এবং কিছু মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরিটি পাটুরিয়া ৫ নং ফেরিঘাট এলাকায় নোঙ্গর করার আগ মুহূর্তে ফেরির তলদেশ ফেটে পানি উঠে ডুবে যায়। ফেরিটি ৪০ বছরের পুরাতন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। ২০২৪ সালের ১৭ই জানুয়ারি পাটুরিয়া ৫ নং ফেরিঘাট সংলগ্ন মাঝ নদীতে বাল্কহেডের ধাক্কায় ইউটিলিটি ফেরি রজনীগন্ধা নয়টি ট্রাক নিয়ে পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হয়। ওই দুর্ঘটনায় ফেরির দ্বিতীয় ইঞ্জিন মাস্টার হুমায়ুন কবীর নিহত হন। গত ২৫শে মার্চ বিকালে দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরিঘাটের পন্টুন ভেদ করে সোহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হয়। দুর্ঘটনায় ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এদের মধ্যে ৮ জন শিশু, ১১ জন নারী ও সাতজন পুরুষ যাত্রী ছিল। ফেরিতে রেলিং না থাকা এবং ঘাট ও অব্যবস্থাপনার কারণেই বাসটি পদ্মায় নিমজ্জিত হয়। ৬ ঘণ্টা পর নিমজ্জিত বাসটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় উদ্ধারকারী জাহাজ।
এদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে একের পর এক দুর্ঘটনায় দেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াতকারী মানুষজনের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। ক্রমান্বয়ে ওই সব অঞ্চলের বেশির ভাগ যাত্রীরাই এই নৌরুট ব্যবহার না করে পদ্মা সেতু দিয়ে আসা-যাওয়া করছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের এখন একটাই দাবি দ্বিতীয় পদ্মা সেতু।
