প্রতিরক্ষাসহ কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে একমত

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায়

প্রতিরক্ষাসহ কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে একমত

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ ও তুরস্ক প্রতিরক্ষা শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে একমত  হয়েছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশ দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে নতুন উদ্যমে কৌশলগত উচ্চতায় নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা সমপ্রসারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর দুই মন্ত্রী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, এই সফর বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করা এবং সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

অন্যদিকে হাকান ফিদান বলেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার প্রচেষ্টা চলছে। তিনি জানান, বর্তমান প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সমপ্রসারণ ছিল বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয়। এ সময় তিনি তুরস্কের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার কথা জানান।

ড. খলিলুর রহমান তুর্কি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশে একটি পৃথক তুর্কি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেন। পাশাপাশি বস্ত্র ও পোশাক, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ শিল্প, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্মার্ট প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে তুর্কি বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন। এ ছাড়া তুরস্কের সহযোগিতায় ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে সহজতর ভিসা ব্যবস্থারও আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানায়, পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। এ বিষয়ে তুরস্কের অব্যাহত মানবিক ও কূটনৈতিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ড. খলিলুর রহমান।
হাকান ফিদান বাংলাদেশের ভূমিকাকে ঐতিহাসিক মানবিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সমগ্র মানবতার পক্ষ থেকে একটি বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে। তুরস্ক রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের এজেন্ডায় রাখতে এবং তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাবে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই মন্ত্রী মতবিনিময় করেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা, গাজা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধ ও সংঘাতের সমাধান কেবল সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব। সফর উপলক্ষে বাংলাদেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং তুরস্কের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় সহযোগিতা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানান হাকান ফিদান।
ড. খলিলুর রহমান এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন দেয়ার জন্য তুরস্ক সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে হাকান ফিদানকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রতিনিধিত্বের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনদিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় পৌঁছান হাকান ফিদান। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। সফরের অংশ হিসেবে তিনি শুক্রবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ ও বহুমাত্রিক সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন