ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে দুই গ্রামের সংঘর্ষ দুই থানার ওসিসহ আহত অর্ধশতাধিক

ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে দুই গ্রামের সংঘর্ষ দুই থানার ওসিসহ আহত অর্ধশতাধিক

ফন্ট সাইজ:

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ফুটবল খেলা নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই থানার ওসি ও ১০ জন পুলিশ সদস্যসহ উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এ সময় সংঘর্ষ চলাকালে দুইপক্ষ ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফরমে অবস্থান নিয়ে স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও টিকিট কাউন্টারসহ কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথে চলাচলকারী অন্তত ৬টি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। পাঁচ ঘণ্টা পর ভৈরব মেঘনা ব্রিজে আটকে থাকা ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন রাত ১টা ৪০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে ও আশপাশের এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

প্রথমে রেলওয়ে থানা পুলিশ ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে ভৈরব থানা পুলিশ ও শহর ফাঁড়ি পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা চালায়। তারা ব্যর্থ হলে ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা ও ভৈরব সেনাবাহিনী ক্যাম্পের সদস্যরাসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম মামুনুর রশীদ ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এএইচএম আজিমুল হক ঘটনাস্থলে এসে দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পৌর শহরের পঞ্চবটি এলাকার যুবকদের সঙ্গে জগন্নাথপুর এলাকার যুবকদের মধ্য ১৫ দিন আগে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার জেরে ৪ঠা জুন বিকালে ভৈরব স্টেশন এলাকায় জগন্নাথপুর এলাকার সোহেল মিয়ার ছেলে লিয়ামকে মারধর করে পঞ্চবটি এলাকার লোকজন। পরে মারধরের ঘটনায় জগন্নাথপুর ও পঞ্চবটি এলাকার লোকজন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

একপর্যায়ে উভয়পক্ষের শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্রসহ ইট-পাটকেল ও রেললাইনের পাথর নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। উত্তেজিত সংঘর্ষকারীরা স্টেশনে হামলা চালিয়ে স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও টিকিট কাউন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ভৈরব থানার ওসি আতাউর রহমান আকন্দ, এসআই ইমদাদুল কবীর, রেলওয়ে থানার ওসি সাঈদ আহমেদসহ অনেকে। তবে গুরুতর আহত হয়েছেন এসআই সাইফুল এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য মুছা। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আমি স্টেশনে এসে অপেক্ষা করছিলাম। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ করে সংঘর্ষের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় এবং একপর্যায়ে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কিশোরগঞ্জগামী যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, আমি আমার দুই সন্তানকে নিয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ করেই সংঘর্ষ শুরু হলে চারদিকে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে, আর ইট-পাটকেলের শব্দে শিশুরা ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. ইউছুফ বলেন, ফুটবল খেলার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে স্টেশন এলাকায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এতে স্টেশনের বিভিন্ন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সোয়া ৯টা থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় রাত ১টা ৪০ মিনিটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি সাঈদ আহমেদ বলেন, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই বাছাই করে দোষীদের শনাক্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় পঞ্চবটি ও জগন্নাথপুর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার জানান, রাত ১টা ১০ মিনিটে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ট্রেন চলাচলের উপযোগী ঘোষণা করে। এরপর রাত ১টা ৩০ মিনিটে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ভৈরব থানার ওসি আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে জগন্নাথপুর ও পঞ্চবটি গ্রামের মধ্যে প্রথমে সামান্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে দুইপক্ষের লোকজন আবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তারা ভৈরব রেলস্টেশন ও রেললাইনে চলে আসে। সেখানে থাকা পাথর নিক্ষেপ করে উভয়পক্ষ একে অপরকে আক্রমণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার এবং কয়েকজন আহত হন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। ঘটনাস্থলে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন