কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের চাঞ্চল্যকর বাঁশের চাটাই কারিগর ও বিক্রেতা জাহাঙ্গীর মিয়া (৪২) হত্যকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর পর এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তারা হলো, কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর মধ্যপাড়ার মৃত ফজর আলীর ছেলে শহীদ মিয়া (৪৮) ও শহীদ মিয়ার স্ত্রী হুসনা খাতুন (৪৫)। গ্রেপ্তারের পর উভয়েই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা হত্যাকাণ্ডের নৃশংস বর্ণনা দিয়েছে। স্ত্রী হুসনা খাতুনের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক থেকে জাহাঙ্গীরকে নিবৃত্ত করতে না পেরে এবং তাদের হাতেনাতে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত অবস্থায় পেয়ে স্বামী শহীদ মিয়া এই হত্যাকাণ্ড ঘটনায়।
শহীদ মিয়া ছুরি দিয়ে জাহাঙ্গীর মিয়ার পিঠে ও লিঙ্গে আঘাত করে তাকে হত্যা করে। পরে ঘটনাস্থল এলাকার আসাদ মিয়ার নেপিয়ার ঘাসের জমিতে লাশ ফেলে রেখে স্ত্রী হুসনা খাতুনকে নিয়ে শহীদ মিয়া চলে যায়। বৃহস্পতিবার বিকালে ঘাতক শহীদ মিয়া কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফখরুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে তাকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বড়পুল এলাকায় পিবিআই অভিযান চালিয়ে শহীদ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া গত পহেলা জুন সোমবার বিকালে কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর মধ্যপাড়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে শহীদ মিয়ার স্ত্রী হুসনা খাতুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২রা জুন মঙ্গলবার হুসনা খাতুন কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফখরুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ২০২৫ সালের ২রা জুলাই রাতে জাহাঙ্গীর মিয়া খুন হন। ওই রাতে স্বজনেরা বিভিন্নস্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি। পরদিন ৩রা জুলাই বিকালে বড়খারচর মধ্যপাড়া গ্রামের আসাদ মিয়ার ঘাসের জমিতে তার লাশ পাওয়া যায়। নিহত জাহাঙ্গীর মিয়া কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর মধ্যপাড়ার দুখু মিয়ার ছেলে। তিনি বাঁশের চাটাই তৈরি ও বিক্রি করতেন। এ ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর মিয়ার মা দিলুয়ারা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে কুলিয়ারচর থানায় গত ২০২৫ সালের ৪ঠা জুলাই মামলা করেন। শুক্রবার সকালে প্রেসব্রিফিং করে এসব তথ্য জানান পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলার ইউনিট ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। তিনি জানান, হত্যারহস্য উদ্ঘাটিত না হওয়ায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স’র নির্দেশে পিবিআই কিশোরগঞ্জের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহবুব আলমকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় তদন্তকারী দল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মামলাটির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গত পহেলা জুন হুসনা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। গ্রেপ্তারের পর জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডে সে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি পিবিআই এর কাছে স্বীকার করে। পরদিন ২রা জুন তাকে আদালতে পাঠানো হলে সে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্বামী শহীদ মিয়ার নাম আসে। পরে বৃহস্পতিবার শহীদ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে আদালতে পাঠানোর পর সেও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ জানান, জাহাঙ্গীর ও শহীদ মিয়া প্রতিবেশী। জাহাঙ্গীর মিয়া বিয়ে করার আগে থেকেই হুসনা আক্তারের সঙ্গে তার পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। জাহাঙ্গীর বিয়ে করার পর কয়েক বছর তাদের মধ্যে পরকীয়ার সম্পর্কে ছেদ ঘটে। বছর চার আগে থেকে পুনরায় তাদের মধ্যে পরকীয়া চলতে থাকে। শহীদ মিয়া স্ত্রী হুসনা ও জাহাঙ্গীরকে এ সম্পর্ক থেকে তাদেরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। গত বছরের ২রা জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে গ্রামের আসাদ মিয়ার নেপিয়ার ঘাসের জমিতে হুসনা ও জাহাঙ্গীর পরস্পরের সঙ্গে দেখা করে। সে সময় শহীদ মিয়া স্ত্রীকে ঘরে না পেয়ে সন্দেহবশত একটি ছুরি নিয়ে ওই ঘাসের জমিতে যায়। সেখানে গিয়ে তার স্ত্রীকে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত অবস্থায় পায়। এ সময় শহীদ মিয়া তার হাতে থাকা ছুরি দিয়ে জাহাঙ্গীর মিয়াকে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করার পর লাশ সেখানেই ফেলে রেখে চলে যায়।
