বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটানির্ভর প্রাকৃতিক কার্পজাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের হালদা নদী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আরও একধাপ কাছে পৌঁছেছে। ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার (এমএবি)’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় নদীটিকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। হালদাপাড়ের বাসিন্দাদের কাছে হালদা শুধু একটি নদী নয় এটি ফটিকছড়ির গর্ব, ঐতিহ্য এবং জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নদীকে ঘিরেই এ অঞ্চলের সংস্কৃতি, কৃষি, অর্থনীতি ও জীবিকার বিকাশ ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি, হালদা নদীকে জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। তাদের মতে, পাঠ্যবইয়ে হালদার ইতিহাস, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব স্থান পেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নদী সংরক্ষণে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে। এ বিষয়ে বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদা নদীকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। বর্তমান বাস্তবতায় ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি হলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়ন- উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সালেক বলেন, নদীর তীরবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজ হয়ে আসছে। এখানকার বিভিন্ন কৃষিপণ্য দেশের নানা অঞ্চলে সুনাম অর্জন করেছে।
তবে নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব ও অর্গানিক কৃষি চর্চা বাড়ানোর পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত রাখা প্রয়োজন। নারায়ণহাট ইউনিয়নের হালদা পাড়ের বাসিন্দা মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, হালদা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম সম্পদ। এই নদীকে রক্ষায় সরকার, স্থানীয় জনগণ, গবেষক ও পরিবেশবাদীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হালদা রক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নদী দূষণ এবং অবৈধ বালি-মাটি উত্তোলন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য আগে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই হালদাকে দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব। হালদা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ হালদা নদী বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটানির্ভর প্রাকৃতিক কার্পজাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহের ক্ষেত্র। প্রতি বছর এই নদীতে রুই, কাতল, মৃগেল ও কালিবাউশসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ প্রাকৃতিকভাবে প্রজনন করে; যা দেশের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
