একটি মহিষ নিয়ে মহা হইচই চলছে। বিশেষ করে ঈদের ক’দিন দেশ ও পুরো বিশ্ব মিডিয়ায় হইচইয়ের অন্ত ছিল না। কারণ মহিষটি একটি বিশেষ জাতের দুর্লভ মহিষ এবং মহিষটির চেহারার সঙ্গে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্টের চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর বড় বড় মিডিয়া সংবাদটা কাভার করেছে। কোরবানির জন্য বিক্রি হয়েছিল মহিষটি। সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারের নজরে আসে, তারা মহিষটিকে কিনে নিজেদের আয়ত্তে নেয়। এখন মহিষটির ঠাঁই হয়েছে জাতীয় চিড়িয়াখানায়। দর্শকরা দর্শনীর বিনিময়ে মহিষটিকে দেখতে পারবে।মহিষটার আয়ু বেড়েছে। খামারে যেভাবে ছিল তার চেয়ে ভালো অবস্থায় এখানে থাকবে।
একই অবস্থা হয়েছিল কয়েক বছর আগের কোরবানির ঈদে, একটি ছাগলের বংশ মর্যাদা নিয়ে। সেই ‘ছাগলকাণ্ড’ থেকে বেরিয়ে এসেছিল একজন আমলার দুর্নীতির তথ্যচিত্র। অনেক দামি সেই ছাগলটিরও হয়তো কোরবানি হয়নি। এর মাঝে চ্যানেল আইয়ের খবরে দেখলাম ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’। বাঘ দিবসে বাঘ বাঁচাও আন্দোলন হচ্ছে। ম্যারাথন দৌড় হচ্ছে। গত ঈদে চ্যানেল আইতে একটি নাটক প্রচারিত হয়েছিল। নাটকটির নাম ছিল ‘লাল মোরগের ঝোল’।
নাটকটিতে বড় বড় অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করেছিল একটি লাল মোরগ। গল্পে ছিল-আদরের মোরগটা রান্না করে খাবে। পেটে যাবে। কিন্তু মোরগটির সঙ্গে শুটিং করতে গিয়ে তার মায়ায় পড়ে যান সবাই। যার কারণে নাটকটির কাহিনীর শেষ দৃশ্যে পরিবর্তন করা হয়। শেষ পর্যন্ত মোরগটির আশ্রয় হয় নাটকের পরিচালকের বাড়িতে। প্রতিদিন ভোরবেলা মোরগের ডাকে এখন সবার ঘুম ভাঙে।
আমাদের সমাজে এরকম নানারকম ঘটনা ঘটে। প্রবাদ আছে যে, প্রাণী থেকে প্রাণী হয় কিন্তু মানুষের থেকে কি কখনো মানুষ হয়েছে? এই প্রবাদটি এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মানুষ তো মানুষ হয়েই বাঁচে। মনুষ্য শিশু মানুষ হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী সাধারণ মানুষের যে অবস্থা তাতে কি আমরা বলতে পারি যে, একজন মানুষ মানুষের মতো বেঁচে আছে? কারণ যে প্রাণীগুলোর কথা বললাম সেগুলো খাদ্য হলেই বাঁচে। কিন্তু একজন মানুষের জন্য দরকার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও স্বাস্থ্য শিক্ষা। এরকম পাঁচটি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তার বাইরেও একজন মানুষ যদি সুন্দর মানুষ হয়ে তার চারপাশটাকে সুন্দর না রাখে আর যদি না ভাবে সবার আগে দেশ।
আর যদি না ভাবে এই সুন্দর দেশটাকে গড়ে তুলতে হবে তাকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য- তাহলে কি সে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারবে? তাই সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্য অনেক কিছু প্রয়োজন। সবার কাছ থেকে সেই প্রয়োজনটুকু পরিপূর্ণ করার জন্য আমরা যদি সবাই হাত বাড়িয়ে দিই, আমাদের মনকে স্থির করে যদি বলতে পারি-এই সুন্দর দেশটাই আমাদের বাংলাদেশ। যুদ্ধ করে পাওয়া একটি দেশ। সুন্দর একটি আবহাওয়ার দেশ।
বিশাল সমুদ্র সৈকতের দেশ, অসম্ভব সুন্দর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের দেশ। যে দেশের উর্বর মাটিতে একটি বিচি ফেললেই চারা গজিয়ে ওঠে, বিশাল গাছ হয়। এই দেশটাকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। সেই ভালোবাসার বীজবপন করতে পারি-আর বলতে পারি সবার আগে আমার দেশ বাংলাদেশ। বাঘ, মহিষ, ছাগল, মোরগ এসব বাঁচাতে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন শুধু খাদ্য। কিন্তু মানুষ বাঁচাতে অনেক কিছু লাগে।
লাগে শিষ্টাচার, লাগে সুুশিক্ষা-যা শৈশবের শুরুতেই রোপণ করতে হয় মনের মাটিতে। শৈশবের নির্ভেজাল শিক্ষাই একজন মানুষকে এনে দেয় জীবনের পরিপূর্ণতা, সাফল্য, মানবিকতা আর দেশপ্রেম। যে দেশপ্রেমে উৎসাহিত হয় একটি উন্নয়নকামী জনপদ, সুশৃঙ্খল জাতি...।
