হাসপাতালেই কাটলো ওদের ঈদ

হাসপাতালেই কাটলো ওদের ঈদ

ফন্ট সাইজ:

১৮ দিন বয়সে হামে আক্রান্ত হয় জুনায়েদ। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে ছেলেকে নিয়ে রাজধানীতে আসেন বাবা জহুর আলী। ভর্তি করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। এরপর কেটে যায় ১৫ দিন। হাসপাতালের চার দেয়ালেই পৃষ্ঠা কাটে তাদের ঈদ। মাঝে ছেলের অবস্থার অবনতি হলে নেয়া হয় আইসিইউতে। দু’দিন আগে শিশুটির অবস্থার উন্নতি হলে সাধারণ বেডে স্থানান্তর করা হয়। শুধু জহুর আলী নয়, হাম আক্রান্ত অসংখ্য শিশুর অভিভাবকের ঈদ কাটে হাসপাতালে। তাদের পরিবারে ছিল না ঈদের আনন্দ। অসুস্থ সন্তানের পাশে কাটে নির্ঘুম রাত।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে কথা হয় জহুর আলীর সঙ্গে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ১৮ দিন বয়সেই ছেলের হাম দেখা দেয়। এরপর ফরিদপুরে নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসকরা ঢাকায় আনতে বলেন। পরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আনা হয়। এখানে অবস্থার অবনতি হলে আইসিউতে ভর্তি করা হয়। এখন ছেলে অনেকটা সুস্থ। তিনি বলেন, এবারের ঈদ কোন দিক দিয়ে গেছে বলতেই পারি না। তার স্ত্রী পপি বেগম বলেন, গত ১৫ দিন থেকে সূর্যের আলো দেখিনি। ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে বন্দি। খাওয়া-ঘুম সব এখানেই। সারাক্ষণ সন্তানের জন্য চিন্তা। সন্তানের যন্ত্রণা। চারপাশে শিশুদের কষ্ট। পাশের বেডেই শিশু মারা যাওয়া। সব মিলে আমার কাছে ঈদের দিনটি আরও কঠিন ছিল।

পাশেই নোয়াখালীর বাসিন্দা তাহমিনা আক্তার ছেলে মো. তাকরিম হোসেনকে কোলে নিয়ে কান্না করছিলেন। নাকে নল। হাতে স্যালাইন। ছেলের কান্না দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি তাহমিনা। নিজেও অঝোরে কান্না করছিলেন। সবার থেকে কান্না লুকানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু চোখের পানি বারবার জানান দিচ্ছিল। এ সময় তিনি মানবজমিনকে বলেন, ২ মাস ধরে ছেলেকে নিয়ে শুধুই ছুটছি। প্রতিটি মূহুর্ত মাথায় সন্তানের জন্য দুশ্চিন্তা। তিনি বলেন, ৩ হাসপাতাল বদলে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করি। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা খরচ। ঢাকায় নিকটাত্মীয় নেই। আমার মা সঙ্গেই থাকেন। স্বামী বাইরে থাকেন। যা প্রয়োজন হয় এনে দেন। চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি আমাদের খাওয়া খরচ অনেক চলে যায়। এ অবস্থায় কিসের ঈদ? তাহমিনা বলেন, ঈদের কথা তো ভুলেই গেছিলাম। প্রতি বছর ঈদের সময় কোরবানি দেয়া নিয়ে আলাদা আনন্দ কাজ করে। কিন্তু এ বছর শুধুই দুশ্চিন্তা। এখানে বসে অনেক বাচ্চার মৃত্যু দেখেছি। অনেক বাচ্চার আইসিউতে লড়াই দেখেছি। এতোদিনেও ছেলেটা সুস্থ হয়নি। এই অসুখের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত সে। সারাক্ষণ কান্না করে। জানি না আর কতদিন লাগবে।

ভোলা থেকে শিশু আয়মানকে নিয়ে ভর্তি হয়েছেন হাফসা বেগম। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। এ অবস্থায় হাতে থার্মোমিটার নিয়ে খেলা করছিল আয়মান। কান্না থামাতে হাফসা মেয়ের হাতে থার্মোমিটার ধরিয়ে দেন। একটু খেলেই কান্না করছিল সে। হাফসা পুরোটা সময় থামানোর চেষ্টা করছেন। এভাবেই যাচ্ছে দিনের পর দিন। নেই ঠিকমতো ঘুম-খাওয়া। হাফসা বেগম মানবজমিনকে বলেন, মেয়ের চিন্তায় ঠিকমতো ঘুম হয় না। ছোট বাচ্চা। কষ্টের কথা বলতেও পারে না। শুধু কান্না করে। ঈদের দিনটাও এভাবেই গেছে। আয়মান সারা দিন কান্না করেছে। কিছু খায়নি। এ অবস্থায় কি ঈদের আনন্দ থাকে? ছেলের কান্না থামাতেই ঈদের পুরো দিন গেছে।

এদিকে, চাঁদপুরের মতলব উপজেলা থেকে ছেলে রাইয়ানকে নিয়ে এসেছেন আমেনা। প্রথম সন্তান। তাই ঈদে পরিকল্পনা ছিল অনেক। কিন্তু হামের কারণে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ছেলেকে নিয়ে ছুটোছুটির মাধ্যমেই চলে যায় ঈদ। আমেনা মানবজমিনকে বলেন, ঈদ নিয়ে কার আশা থাকে না? কিন্তু পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে বাধ্য করে। তাই আমিও ঈদের আনন্দ ত্যাগ করেছি। এখন ছেলের সুস্থতাই আমার আনন্দ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন