ছয় শিশুমৃত্যুর দায় আদ্‌-দ্বীনের

ছয় শিশুমৃত্যুর দায় আদ্‌-দ্বীনের

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীর মগবাজারস্থ আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে। পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ কথা জানিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে ধরেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। এদিকে হাসপাতালটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। লাইসেন্স কেন বাতিল হবে না- মর্মে ৩ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালে এসি বন্ধ ও চরম অবহেলায় ৬ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির হুঁশিয়ারি দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “আমার আইনে যতটুকু কঠোর হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাবো। এবার আর কাউকে মাফ করে দেয়া যায় না।” স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার ৩টায় তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং দায়িত্বরত নার্স-স্টাফদের চরম অবহেলার প্রমাণ মিলেছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধ ও অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। হাসপাতালটির যে পোস্ট অপারেটিভ রুমে এই ঘটনা ঘটেছে, সেটি আমরা ইতিমধ্যেই সিলগালা করে দিয়েছি। তবে পুরো হাসপাতালে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকায় হুট করে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। আমরা আগামী দুইদিন বন্ধের মধ্যে আইন খতিয়ে দেখবো এবং আগামী রোববারের মধ্যে হাসপাতালটির বিষয়ে চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্তে পৌঁছাবো, ইনশাআল্লাহ। হাসপাতালগুলোর এই লাগামহীন অব্যবস্থাপনা রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা যেভাবে সচিব, ডিজি এবং প্রতিমন্ত্রীসহ সবাই মিলে আকস্মিক পরিদর্শন কার্যক্রম সাজাচ্ছি এবং যে ধরনের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভবিষ্যতে আর কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এভাবে বদ্ধ ঘরে মানুষ বা শিশু রাখার দুঃসাহস দেখাবে না। তিনি জানান, বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে এখন থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ও ভবন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি, যা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

৬ শিশুর মৃত্যুকে কেবল পেশাগত অবহেলা নাকি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এটি নিশ্চিতভাবেই একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ এবং এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই মামলা হয়েছে। আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনরা শিশুদের মরদেহ নিয়ে গেছেন, যা আসামিরা আইনি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। তবে এটি রাতের আঁধারে ঘটা কোনো গোপন ঘটনা নয়, এটি শতভাগ প্রমাণিত সত্য। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, বিজ্ঞ আদালত আসামিদের কোনো ছাড় দেবেন না।

তদন্ত কমিটির বরাত দিয়ে মন্ত্রী জানান, আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের ২ নম্বর পোস্ট অপারেটিভ কক্ষটি মোটেও হাসপাতাল পরিচালনার উপযোগী ছিল না। ৯০০ বর্গফুটের ওই কক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ উপস্থিত ছিল। দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশন না থাকায় কক্ষটিতে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যায়, যা নবজাতকদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের নিয়ে আমরা একের পর এক জুম মিটিং করছি। আমাদের নির্দেশনা এবং ব্যবস্থাপনা দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে, যা আপনারা শিগগিরই মাঠে দেখতে পাবেন।

আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আগামী ৩ দিনের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নোটিশ দেয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, আপনি ডা. শেখ মহিউদ্দিনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আদ্‌?-দ্বীন হাসপাতাল, ২, বড় মগবাজার, ঢাকায় গত ২৭/০৫/২০২৬ খ্রি. তারিখে ৬ (ছয়) নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষিতে, ঞযব গবফরপধষ চৎধপঃরপব ধহফ চৎরাধঃব ঈষরহরপং ধহফ খধনড়ৎধঃড়ৎরবং (জবমঁষধঃরড়হ) ঙৎফরহধহপব, ১৯৮২-এর ১১ (১) ধারা অনুযায়ী মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহোদয় ঘটনাস্থল পরিদর্শনের (ওহংঢ়বপঃরড়হ) জন্য ০১/০৬/২০২৬ খ্রি. তারিখে স্মারক নং-স্বা: অধি:/প্রশাসন-৪/বিবিধ/২০১৮/২০২৪.১ (৬) মোতাবেক কমিটি গঠন করেন। উক্ত কমিটিকে ৩ (তিন) দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেয়া হয়।

তদন্তকালে কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ডিজি, এডি, শিশু বিভাগের প্রধান, এনআইসিইউতে কর্তব্যরত চিকিৎসক, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত নার্স, আয়া, রোগী, রোগীর অ্যাটেনডেন্ট এবং মৃত নবজাতকদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। কমিটির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে “The Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982” অধ্যাদেশের বিধানসমূহ যথাযথভাবে পালিত না হওয়ায় ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায় নিরূপণ করেছেন। আপনার হাসপাতালটি উল্লিখিত অধ্যাদেশের ৮ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত (লাইসেন্স নং-ঐঝগ ৪৫১০০৫৯)। উপরোক্ত অবস্থায় উক্ত অধ্যাদেশের ১১ (২) (খ) ধারা মোতাবেক কেন আপনার, অত্র অধ্যাদেশের অধীনে প্রদত্ত লাইসেন্স বাতিল করা হবে না মর্মে পত্র জারির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে (০৭-০৬-২০২৬ বিকাল ৫টার মধ্যে) কারণ দর্শাতে বলা হলো। আপনাকে কারণ দর্শানোর জবাব প্রদানের স্বার্থে তদন্ত প্রতিবেদনের কপি পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেয়া হলো বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন