সিলেটে ঝুমকির মৃত্যু নিয়ে রহস্য

সিলেটে ঝুমকির মৃত্যু নিয়ে রহস্য

ফন্ট সাইজ:

একটি মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ সিলেট শহরতলীর বাঘায়। ঈদের পর থেকে দফায় দফায় হচ্ছে বৈঠক। তদন্তের দাবি করছেন এলাকার মানুষ। মেয়েটির নাম ঝুমকি দেব। মাত্র দুই মাস আগে ধুমধাম করে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। স্বামীর সোহাগে ভরে ওঠার কথা সংসার।
অথচ সেই ঝুমকির ঝুলন্ত লাশ মিললো ভাসুরের ঘরে। ঘটনায় দিন দিন রহস্য দানা বাঁধায় আদালতে ঝুমকির স্বামীসহ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন ঝুমকির পিতা সন্নৎ কুমার দেব। ঝুমকির বাড়ি গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের গৌড়াবাড়ি গ্রামে। ২০২৪ সালে ইতিহাসে মাস্টার্স পাস করে ঝুমকি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ভাই দুবাই থাকলেও বর্তমানে যুদ্ধের কারণে কর্মহীন। আর পিতা সন্নৎ কুমার সবজির ব্যবসা করেন স্থানীয় বাজারে। এলাকায় ঝুমকি ছিল সবার আদরের। কলেজ জীবন থেকে ঝুমকি পরিবারের দুঃখ ঘোচাতে টিউশনি করতো। একজন শিক্ষক হিসেবে সবার কাছে জনপ্রিয় ছিল। গত ৯ই মার্চ ঝুমকির বিয়ে হয়।

স্বামী একই ইউনিয়নের হেতিমগঞ্জ পূর্বপাড়া গ্রামের চঞ্চল দাস। তিনি একজন ব্যবসায়ী। স্থানীয়রা জানিয়েছেনÑগত ২৪শে মে স্বামীর বাড়ির ভাসুরের ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় ঝুমকির মরদেহ পাওয়া যায়। বিয়ের দুই মাসের মাথায় ঝুমকির মৃত্যু কেনÑএ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় এলাকায়। ঝুলে থাকা লাশের ধরন দেখে ঝুমকির পরিবার ও স্বজনরা ঘটনাটিকে হত্যা বলে দাবি করেন। আর এ কারণে তারা লাশের ময়নাতদন্তও করিয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ ওই দিনই ঝুমকির ভাসুর রঞ্জিত দাসের দেয়া অপমৃত্যু মামলা গ্রহণ করেছে। তবে পুলিশ তদন্তের স্বার্থে ঝুমকি ও তার স্বামীর মোবাইল ফোন জব্দ করেছে। তদন্ত চালাচ্ছে ঘটনারও। গোলাপগঞ্জ থানার ওসি আরিফুল ইসলাম গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেনÑনিয়ম অনুযায়ী একটি অপমৃত্যু মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের জন্য অপেক্ষায় আছি।

ওই রিপোর্টে যদি অন্য কোনো প্রমাণ মিলে তাহলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেনÑপুলিশ ঘটনার তদন্তও চালাচ্ছে। এদিকে ঝুমকির মৃত্যু নিয়ে বাঘায় তোলপাড় চলছে। সবার পরিচিত একটি শিক্ষিত মেয়ে কোনো কারণ ছাড়াই আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারেন না বলে জানান এলাকার মানুষ। আর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আচরণেও তাদের কাছে রহস্য মনে হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঈদের পরের শনিবার বাঘায় সামাজিকভাবে বৈঠক ডাকা দেয়। বৈঠকে এলাকার জনপ্রতিনিধিরা সহ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এরপর আরও কয়েক দফা বৈঠক হয়। ওইসব বৈঠকে আলোচনাক্রমে ঝুমকির পিতা সন্নৎ কুমার দাস গোলাপগঞ্জ থানায় প্রথমে হত্যা মামলা করতে চেয়েছিলেন। পরে গত ২রা মে তিনি সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় আদালতে হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় তিনি ঝুমকির স্বামী চঞ্চল দাস সহ পরিবারের লোকজনকে আসামি করেছেন।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মিসবাহুর রহমান জানিয়েছেনÑআদালত ঝুমকির পিতার মামলা গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে অপমৃত্যু মামলার রিপোর্ট দ্রুত আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। ওই রিপোর্ট আসার পর পরবর্তী কার্যক্রম চালানো হবে বলে জানান তিনি। এদিকে ঝুমকির পিতা সন্নৎ দাস মামলার এজাহারে দাবি করেছেন-ঝুমকিকে বিয়ের পর কেবল ফিরা যাত্রার দুইদিন নাইওরী করতে দিলেও মেয়ে জামাই ও তার পরিবারের সদস্যরা তাকে নাইওর আসতে দিতো না। বিয়ের অল্পদিন পর থেকে মেয়ে জামাই চঞ্চল দাস, তার অপর দুই ভাই সঞ্জিত দাস ও রঞ্জিত দাস, তাদের স্ত্রী নন্দিনী দাস ও নিপা দাস জেমি এবং একান্নবর্তী চাচাতো ভাই স্বপন দাস ঝুমকিকে যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে শুরু করে। চঞ্চল দাস ও তার পরিবারের সদস্যরা কমদামি ফার্নিচার দেয়ায় ও স্বর্ণের চেইন না দেয়ার কারণে ঝুমকিকে গালিগালাজ করতো। কমদামি ফার্নিচার বদল করে নতুন ফার্নিচার আনার জন্য চাপ দিতো। সম্প্রতি চঞ্চল দাস তার পরিবারের সদস্যদের প্ররোচনায় নিজস্ব ব্যবসা চালুর জন্য ৫ লাখ টাকা এনে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ঝুমকির কাকা হরিপদ দেব ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন-লাশ নিজ শয়নকক্ষে নয় বরং তার ভাসুরের শয়নকক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলানো, পা খাটের বিছানার সঙ্গে লাগানো, জিহ্বা মুখের ভেতরে ঢুকানো, দুই হাতের কব্জিতে শক্ত করে বাঁধা ছিল।

এ ছাড়া গলার মাঝামাঝি সমান্তরাল রশির দাগ পাওয়া যায়। আলামত আত্মহত্যার লাশের ক্ষেত্রে পাওয়া অস্বাভাবিক। এদিকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করছেন ঝুমকির স্বামীর এলাকার ১ নং ওয়ার্ডের মেম্বার শামীম আহমদ। তিনি বলেনÑঘটনার সময় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাইরে ছিলেন। তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধের কোনো খবর তার কাছে আসেনি। তিনি বলেন-প্রশ্ন উঠায় ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। পুলিশ এরই মধ্যে ঝুমকি ও তার স্বামীর মোবাইল ফোন জব্দ করেছে।


ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন