বিশ্বকাপ ফুটবলের উৎসব শুরু হতে বাকি ৬ দিন। আজতেকা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে স্বাগতিক মেক্সিকোর লড়াই দিয়ে পর্দা উঠবে ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের। এই মহোৎসবে যোগ দিতে তিন আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমী জড়ো হচ্ছেন। আয়োজক তিন দেশেই ছেয়ে গেছে পোস্টার, ফেস্টুনে। স্টেডিয়াম সেজেছে নতুন রূপে। দেয়ালচিত্রে শোভা পাচ্ছে তারকাদের গ্রাফিতি। প্রাণবন্ত এ আয়োজনের মাঝে সমর্থকদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা। বিশেষ করে মেক্সিকোর মাদক চক্র, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ প্রবণতা সেখানে বিশ্বকাপ উপভোগ করা নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মেক্সিকোর তিন আয়োজক শহরের নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির নানা দিক। বিশ্বকাপের সময় বিদেশ থেকে আগত সমর্থকদের নিরাপত্তায় মেক্সিকো সরকার ১ লাখ নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এ পরিকল্পনার নাম দেয়া হয়েছে ‘প্ল্যান কুকুলকান’। মায়ান পুরাণের এক সর্প দেবতার নামানুসারে এই অভিযানের নামকরণ করা হয়। এ নিরাপত্তা বলয়ে সহযোগিতা করবে মেক্সিকোর ফেডারেল, রাজ্য, স্থানীয় পুলিশ ও সহ-আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। ১১ই জুনের উদ্বোধনী ম্যাচসহ ৫টি ম্যাচের ভেন্যু রাজধানী মেক্সিকো সিটি।
এ শহরে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস। জনবহুল এ শহরে পকেটমার,ছিনতাই ও ভুয়া ট্যুর গাইডের মতো অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় রাতে দর্শকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রায় ৫৬ হাজার পুলিশ মোতায়েন করার চিন্তা করছে দেশটির সরকার। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে ভাবা হচ্ছে গুয়াদালাহারা ও মনটেরিকে। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের চারটি ম্যাচ আয়োজন করা গুয়াদালাহারা মেক্সিকোর অন্যতম বিপজ্জনক শহর। এখানে ভাড়াটে খুনি ও মাদক চক্র জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের মূল ঘাঁটি রয়েছে। এই রাজ্যে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ নিখোঁজ। তাদের সন্ধানে কাজ করছে স্থানীয় পুলিশ। বছরের পর বছর ধরে, বেসামরিক সংগঠনগুলো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে প্রতিদিন তল্লাশি চালাচ্ছে এবং শত শত মানুষের মরদেহ উদ্ধার করেছে। চাঞ্চল্যকর ব্যাপার হচ্ছে, সম্প্রতি স্তাদিও আকরন স্টেডিয়ামের কাছাকাছি স্থান থেকে গোপন কবরের সন্ধান মিলেছে। সেখান থেকে কিছু মরদেহ উদ্ধার করেছে প্রশাসন। বিশ্বকাপের আগে নিরাপত্তার জন্য গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামের বাইরে কর্মীদের ৪ মিটার উঁচু লোহার নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে। অন্যদিকে মার্কিন সীমান্ত-সংলগ্ন মনটেরি শহরটি মাদক ও অবৈধ জ্বালানি পাচারের প্রধান রুট হিসেবে কুখ্যাত।
এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী কার্টেলগুলোর মধ্যে সহিংসতা এবং অর্থ পাচারের ঘটনাও এখানে নিয়মিত ঘটে। অপরাধী চক্রগুলো মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি চালায়। পর্যটকরা ছোটখাটো চুরি ও প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবণা রয়েছে। টিকিট জালিয়াতি এবং নকল টিকিট বিক্রির মতো প্রতারণার ঘটনা দেশের যেকোনো প্রান্তে ঘটতে পারে। মানব পাচারও একটি বড় উদ্বেগের কারণ। কর্তৃপক্ষ ও এনজিওগুলোর আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর আগমনে যৌন পল্লিতে চাহিদা বাড়বে। চাহিদা মেটাতে অপরাধী চক্রগুলো শিশু, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং অভিবাসীদের জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করতে পারে। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে নিয়োজিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই মেক্সিকো সিটিতে বিক্ষোভ করেছে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন ও সাবওয়ে স্টেশনগুলোর বাইরে বড় ধরনের আন্দোলনের ছক কষছে তারা। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মেক্সিকোর বড় কার্টেলগুলোর মধ্যকার বন্দুকযুদ্ধ বা সহিংসতা সাধারণত স্থানীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে বিদেশি পর্যটকদের সরাসরি কোনো মাদক যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা কম। দর্শকদের জন্য মূল ঝুঁকি হলো টিকিট জালিয়াতি ও নকল টিকিট চক্র। তাই অনুমোদিত উৎস থেকে সমর্থকদের টিকিট ক্রয় এবং গভীর রাতে চলাচলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
