অভিনেত্রী শিল্পা শিন্ডে তার বিরুদ্ধে ওঠা গ্রেপ্তার দাবির জবাব দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি স্বীকার করেন যে, ২০১৬ সালে জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘ভাবিজি ঘর পর হ্যায়!’-এর প্রযোজকের বিরুদ্ধে তিনি যে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন, তা সত্য ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শিল্পা এবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দেন এবং বলেন, তিনি জানেন তিনি যা করেছেন তা সঠিক। নেতিবাচক মন্তব্য তাকে বিচলিত করে না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
সমালোচনার জবাবে শিল্পা বলেন, অনেকেই পুরো পডকাস্ট না দেখে শুধু একটি ক্লিপের ভিত্তিতে তাকে বিচার করছেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, পুরো পডকাস্ট না দেখে একটি লাইন শুনে বিচার করা ভাড়া করা পিআরের দুর্বল মানসিকতার পরিচয়। যারা আমাকে বুঝেছেন, সেই শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধন্যবাদ।
হিন্দিতে দেয়া বক্তব্যে শিল্পা বলেন, আমি সাধারণত মন্তব্য পড়ি। কারণ আমি জানি আমার ভক্তরা আমাকে কী লেখেন। ভারতীজি এবং হর্ষের পডকাস্ট দেখলে সেখানকার মন্তব্যও দেখতে পাবেন। এই পিআর প্রচারণা এবং যে মন্তব্যগুলো আসছে, তাদের বলতে চাই- যেমন কর্ম, তেমন ফল।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি না বুঝেই মানুষ নানা কথা লিখছে। আমি জানতাম এমনটাই হবে, কারণ
পৃথিবী ভালো কিছু কখনও মূল্যায়ন করে না। আজ যারা মন্তব্য করছেন, তারা ভাবছেন আমার এটা বলা উচিত হয়নি। আমি দশ বছর আগেও বলতে পারতাম, যখন আমি ওই শো করছিলাম। কিন্তু আমি এখন বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে শিল্পা বলেন, আমি আপনাদের সামনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে দাঁড়াইনি। আমি আমার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়েছি। কারণ সেই মিথ্যাটা সত্যিই মিথ্যা ছিল। কেউ আমাকে এটা বলতে বাধ্য করেনি। আমি সেই মিথ্যা নিয়ে বাঁচতে পারতাম না। কোনো একদিন আমাকে এটা বলতেই হতো।
তিনি বলেন, তখন আমার সঙ্গে কী ঘটেছিল, আপনারা জানেন না। আমি চাই না আপনাদের বা আপনাদের পরিবারের কারও জীবনে এমন পরিস্থিতি আসুক। সেই সময়টা কেমন ছিল, তা আমি জানি। অভিনেত্রী দাবি করেন, তিনি অর্থের জন্য কিছু করেননি। তিনি বলেন, আমি তখন শো ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার ওপর যে দোষ চাপানো হয়েছিল, তাও মেনে নিয়েছিলাম। বিগ বস-এর পর এক ব্যক্তির সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে বলেন, তার বাবা এমন এক অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন যা তিনি করেননি। পরে আত্মহত্যা করেন। তিনি বলেন, আমার সংগ্রামের গল্প দেখে তিনি বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
শিল্পা বলেন, এটা আমার জন্য বিশাল বিষয় ছিল। কারণ আমি জানি তখন কী যুদ্ধ আমি লড়েছিলাম। যার ওপর আমি দোষ চাপিয়েছিলাম, তিনি জানেন আসলে কী ঘটেছিল। আমি তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ‘দুঃখিত’ শব্দটি খুব ছোট, কিন্তু তিনিও জানেন আমি তখন কী অবস্থার মধ্যে ছিলাম। তখন আমার মনে হয়েছিল আমার আর কোনো পথ নেই। আমি আত্মহত্যার কথাও ভাবছিলাম। তিনি আরও বলেন, মানুষ আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে, গালিগালাজ করেছে। কিন্তু যখন আপনি জানেন আপনি কোনো ভুল করেননি, তখন ভয়ও থাকে না। তখন কেউ আমাকে সমর্থন করেনি, তাই এখনো আমি কারও সমর্থন আশা করি না। আমি সবকিছুর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
একই সঙ্গে শিল্পা বিনোদন জগতের প্রযোজকদেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যেসব প্রযোজক শিল্পীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, তারা ১০-১৫ বছর ধরে কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু আমাদের মতো শিল্পীদের চুপ করে থাকতে বলা হয়। আমরা সত্যের জন্য লড়াই করি। আজ আমি সেটাই করেছি। আমি সত্য বলেছি। সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মানুষ যা খুশি বলুক। তবে আমার একটি অনুরোধ, আপনারা যদি সময়টা এমন কাউকে সাহায্য করতে ব্যয় করেন, যার সত্যিই সাহায্য প্রয়োজন, তাহলে সেটাই বেশি উপকারে আসবে। আমি কোনো ভুল কাজ করতে যাচ্ছি না। নিজের জীবন এবং নিজের মঙ্গলের দিকে মনোযোগ দিন। এখন আর আমি কারও সমর্থন প্রত্যাশা করি না।
শিল্পার এই ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। কারণ তার স্বীকারোক্তির পর অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং বিভিন্ন সংগঠন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে। কেউ কেউ তার গ্রেপ্তারও দাবি করেছেন। ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর মেন’ নামের একটি সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে অভিযোগ করেছে যে, শিল্পা মিথ্যা যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের করেছিলেন এবং এ জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, তারা প্রকাশ্যে এসব বলার সাহস দেখাচ্ছে। কারণ তারা জানে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না। আরেকজন মন্তব্য করেন, পদ্ধতিটা ভুল ছিল। কিন্তু মানুষ অন্যের সঙ্গে যেমন আচরণ করে, তার সঙ্গে তেমন আচরণ হওয়াই উচিত। আরেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, পুরো ব্যবস্থাই পচে গেছে। প্রভাবশালী নারীদের তুষ্ট করতেই যেন এটি কাজ করে। পুরুষদের এমন মানসিক হয়রানি সহ্য করতে হয়। আরেকটি মন্তব্যে বলা হয়, এই স্বার্থপর নারী একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছেন, আর এখন কুমিরের কান্না কাঁদছেন। তিনি যদি গ্রেপ্তার না হন, তাহলে তা মুম্বই পুলিশের জন্য লজ্জার বিষয় হবে। আরেকজন লিখেছেন, এ কারণেই পুরুষরা নারী ও নারীবাদ উভয়ের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। কিছু নারী আইনের অপব্যবহার করছে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ভারতী সিং ও হর্ষ লিম্বাচিয়ার পডকাস্টে অংশ নিয়ে শিল্পা শিন্ডে অনেককে বিস্মিত করেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেন যে, ‘ভাবিজি ঘর পর হ্যায়!’-এর প্রযোজকের বিরুদ্ধে তার যৌন হয়রানির অভিযোগটি সত্য ছিল না। তিনি সরাসরি বলেন, ওটা মিথ্যা ছিল এবং কী পরিস্থিতিতে তিনি অভিযোগটি করেছিলেন, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত ২০১৬ সালে। সে সময় শিল্পা জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ভাবিজি ঘর পর হ্যায়!’ ছেড়ে দেন, যেখানে তিনি অঙ্গুরি ভাবি চরিত্রে অভিনয় করতেন। তখন তিনি সিরিজটির প্রযোজক সঞ্জয় কোহলির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগ আনেন। তার দাবি ছিল, সঞ্জয় তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই অভিযোগ টেলিভিশন জগতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে সঞ্জয় কোহলি শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন এবং দাবি করেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
