ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের চুক্তি নিয়ে বিশ্বকে দোদুল্যমান অবস্থায় রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বার বার বলছেন যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হচ্ছে। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফরে এসে ঘোষণা দিচ্ছেন- কয়েক ঘন্টার মধ্যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আসছে। আসলে ইউরেনিয়াম ইস্যুতে ইরান তার অটল অবস্থানে আছে। ফলে ট্রাম্প বা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যতই বলুন যুদ্ধের ইতি ঘটছে, চুক্তি হচ্ছে, তা যেন হালে পানি পাচ্ছে না। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের চুক্তি এখনো ‘পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি’ বলে মন্তব্য করে বিশ্বজুড়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন ট্রাম্প। কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি বলে আসছেন, তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে হবে, নইলে নতুন হামলার মুখে পড়তে হবে।
তবে এখন তিনি জানিয়েছেন, আলোচনায় তাড়াহুড়া না করতে তিনি তার আলোচকদের নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই সমঝোতার দিকে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, আমার প্রতিনিধিদের বলেছি, এখন কোনো চুক্তির জন্য তাড়াহুড়া না করতে। সময় এখন আমাদের পক্ষেই আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা ঘনীভূত, তখনই তিনি এ মন্তব্য করেন।
গত ৮ এপ্রিল থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে। মধ্যস্থতাকারীরা স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই সংঘাতের ফলে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ ইরান উপসাগরীয় নৌপথে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন অবরোধ বহাল থাকবে, যতক্ষণ না কোনো চুক্তি সম্পন্ন, যাচাই এবং স্বাক্ষরিত হয়।
আরেক পোস্টে তিনি লিখেছেন, আমি যদি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করি, তাহলে সেটি হবে ভালো ও সঠিক চুক্তি। এটি এখনো পুরোপুরি আলোচনা শেষ হয়নি। তাই যারা কিছু না জেনেই সমালোচনা করছে, তাদের কথা শুনবেন না। আমার আগের নেতারা বহু বছর আগে এই সমস্যার সমাধান করা উচিত ছিল। আমি খারাপ চুক্তি করি না। এর আগে ট্রাম্প লিখেছিলেন, চুক্তিটি মূলত আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে, এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে খুবই গুরুতর আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তার এই মন্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশল নিতে পারে এবং এমন একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি মেনে নিতে পারে, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা হবে না।
নয়াদিল্লি সফরের সময় দেয়া সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কাগজের পেছনে লিখে কোনো পারমাণবিক চুক্তি করা যায় না। তিনি আরও বলেন, প্রণালি অবিলম্বে খুলে দিতে হবে। এরপর নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে আমরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ইরানের কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার অঙ্গীকার নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করব। এতে বছরের পর বছর লাগবে না। তবে প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো সমাধান করতে কিছুটা সময় লাগবেই। রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুই মাসের মধ্যে আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিতে পারে। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত এই কৌশলকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে হবে। যদি তা না হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টের হাতে এখন যেমন সব বিকল্প আছে, ৬০ দিন পরও তেমনই থাকবে।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারা এখনো অমীমাংসিত। এর মধ্যে ইরানের জব্দকৃত সম্পদের বিষয়টিও রয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির মতে, ইরানি কর্মকর্তারাও খসড়া চুক্তির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধের দাবি জানালেও, বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা যেকোনো চুক্তির পর আরও ৬০ দিনের জন্য পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরান এখনো বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে প্রস্তুত যে আমরা পারমাণবিক অস্ত্র চাই না। তবে এই অঙ্গীকার চুক্তির লিখিত অংশে থাকবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স-এর মতে, আলোচনার সময় তেল, গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল ও এ সংক্রান্ত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেয়া হবে, যাতে ইরান অবাধে তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারে। শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মিশর, জর্ডান ও বাহরাইনের নেতারা, পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, পাকিস্তান খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আরেক দফা আলোচনা আয়োজনের আশা করছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির শুক্রবার ও শনিবার তেহরান সফর করেছেন। তিনিও ওই ফোনালাপে অংশ নেন। শরিফের ভাষায়, এটি ছিল চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
