মরিয়মের আত্মহননের নেপথ্যে

সস্ত্রীক রিমান্ডে গাজী নজরুল

মরিয়মের আত্মহননের নেপথ্যে

ফন্ট সাইজ:

‘বিয়ের পর থেকেই গাজী নজরুল ও তার স্ত্রী মাকসুদা আমার মেয়েকে নির্যাতন করতো। আমার মেয়ে প্রায়ই আমাকে ফোনে বলতো। সেই নির্যাতন থেকেই আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। আর এই সবের মূলহোতা হলো আমার শ্যালক ওবায়দুর। ওর জন্যই আমি এমপি’র সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছি। এমপি’র সঙ্গে বিয়ে না হলে আজ এতকিছু হতো না।’ গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে মেয়ের লাশ নিতে এসে অশ্রুশিক্ত হয়ে এসব কথা বলছিলেন নিহত মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। এ সময় মরিয়মের বোন, মা-সহ পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে পরিবেশ।

এর আগে রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ সদস্যদের বরাদ্দকৃত ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার সময়ে ওই ফ্ল্যাটেরই আরেক কক্ষে এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় রোববার রাতেই নজরুল ও মাকসুদাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ। ওই রাতেই শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলা করেন মারিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ। মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয় গাজী নজরুল ইসলামকে। প্রথম স্ত্রী মাকছুদা দ্বিতীয় আসামি ও নিহত মরিয়মের মামা ওবায়দুর ৩ নম্বর আসামি। মামলার এজহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গত জুনে এমপি নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের শরিয়ত মতে বিয়ে হয়। বর্তমানে ন্যাম ভবনের ৫নং বিল্ডিংয়ের ২০৩ নম্বর বাসায় থাকতো সে। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। যা বিভিন্ন সময়ে তাদের ফোনেও জানিয়েছিলেন মরিয়ম। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল ইসলাম মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত তাদের বাসায় যেতে বলেন। এরপর মরিয়মের বাবা মাসুম তার শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ন্যাম ভবনে যান। দেখেন তার মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে মেয়ের বিছানার উপরে ‘একটি সুসাইড নোট’ দেখতে পান তিনি। থানায় দায়ের করা মামলায় দুই দফা মাসুম বিল্লাহ দাবি করেছেন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলেই তার মেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।

কী আছে সুসাইড নোটে: মামলায় মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ তার মেয়ের লাশের পাশের বিছানা থেকে একটি সুসাইড নোট পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেও পুলিশের ভাষ্য পাঁচটি সুসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে ক্রাইমসিন থেকে। সুসাইড নোটগুলোতে দেখা যায়- সাদা কাগজের দু’টি আলাদা আলাদা পাতায় লাল কালি দিয়ে লেখা রয়েছে- ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকারে ছিল তার বউ-এর। আর আমি ছিলাম বোকা...। অন্য কারও স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ...। কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের...কারণ...ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেয়ার বিষয় নয়...ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ।’ সাদাকাগজের আরেকটি চিরকুটে লেখা ছিল- ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই...তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই...।’ এই দু’টি চিরকুট ছাড়াও ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’-এর প্যাডে আরও দুই পাতার চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। কালো কালির ওইসব চিরকুটের হাতের লেখার সঙ্গে লাল কালির চিরকুটের হাতের লেখার অমিল দেখা যায়। যার একটিতে লেখা আছে-‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সঙ্গে। জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে...যুদ্ধের শেষপ্রান্তে যেয়ে দেখি সে ছিল বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’ আরেকটিতে লেখা ছিল-‘আমি হেরেছি তুমি জিতেছো কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষে দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি... ভেবে নাও ওই হাসির কারণেই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’ আরেকটি সাদাকাগজের উপর লাল কালিতে লেখা ছিল ১২-০৭-২০২৬। তার নিচে ছিল ঘুমের আগেও আমল। ও বিভিন্ন সূরা লেখা ছিল তাতে।

চারদিনের রিমান্ডে নজরুল: এদিকে রাতে মামলার পর পুলিশ হেফাজতে থাকা গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে দুপুর ৩টার দিকে এজলাসে তোলা হয় তাদের দু’জনকে। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার নজরুল ও মাকসুদা ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। তবে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মাহবুবুর রহমান গাজী নজরুলের বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং তার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় তুলে ধরে রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আর্জি জানান।

তখন রাষ্ট্রপক্ষের ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী মামলার অভিযোগ ও মৃত্যুর আগে পাওয়া চিরকুটের বিষয় তুলে ধরে রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। একইসঙ্গে পিপি’র বক্তব্যে উঠে আসে মরিয়মের বিয়ে, তাকে ঘিরে পারিবারিক বিরোধ, বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় যাতায়াত এবং মৃত্যুর আগে লেখা চিরকুটে আসামিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। পরে উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল ইসলামের আদালত গাজী নজরুল ইসলামের ৪ দিন ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার দুপুরে মরিয়মের লাশ তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেয় পুলিশ। দুপুর ২টার দিকে এম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করে তার পরিবার।

নিহত মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, আমার মেয়ের আত্মহত্যার পেছনে একমাত্র মাস্টারমাইন্ড হলো ওবায়দুল। ওখান থেকেই আজকে আমার মেয়েকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসছে। আজকে এই রাস্তায় আনার পেছনে সম্পূর্ণ দায়ী হলো ওবায়দুল। না হলে আজকে এমপি’র সঙ্গে আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে হতো না। যার খেসারত ও জীবন দিয়ে দিলো। ওবায়দুর আমার বাসায় থেকে আমার মেয়েকে প্রতিনিয়ত কোচিংয়ের নাম করে এমপি’র সঙ্গে দেখা করানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতো। সে-ই মাধ্যম ছিল। ওবায়দুরই এমপি’র সঙ্গে আমার মেয়ের সম্পর্ক জড়িয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। যখন বুঝছি, তখন আর ফিরে আসার সুযোগ ছিল না। হুমকি দিতো অনেক।
এদিকে মরিয়ম মৃত্যুর বিষয় নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেছেন, লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের পর তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এমপি নজরুল ও মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে। তদন্তের স্বার্থে ময়নাতদন্তে কি পাওয়া গেছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
তবে এতসব কাণ্ড যাকে ঘিরে সেই গাজী নজরুল ইসলাম আদালতের রিমান্ড শুনানি শেষে গাড়িতে ওঠার সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম না। সে নিজে নিজে আত্মহত্যা করেছে।’