আফগানিস্তানে বিয়ের নামে কন্যাশিশু বিক্রি, ‘বাচ্চা বাজি’

আফগানিস্তানে বিয়ের নামে কন্যাশিশু বিক্রি, ‘বাচ্চা বাজি’

ফন্ট সাইজ:

টুকটুকে সুন্দর পরওয়ানা মালিক। বয়স মাত্র ৯ বছর। এ বয়সে তার পড়াশোনা করার কথা। বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকার কথা। প্রজাপতি ধরে বেড়ানোর কথা। প্রকৃতির মাঝে নিজেকে খুঁজে নেয়ার কথা। কিন্তুপরিবারের অভাব ঘোচাতে, খাবারের খরচ জোগাড় করতে তাকে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক পুরুষের কাছে বিয়ে দিয়ে দেন তার পিতা। এই বিয়ে আসলে একরকম বিক্রি। অশ্রুসিক্ত চোখে পিতা আব্দুল মালিক বরের কাছে অনুরোধ করেন, যেন তিনি তার ছোট মেয়েটির প্রতি সদয় হন। তিনি বলেন, এটা আপনার বউ। দয়া করে ওর খেয়াল রাখবেন। এখন থেকে আপনি ওর সবকিছু দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত। অনুগ্রহ করে ওকে মারবেন না।

পরওয়ানা মালিক আফগানিস্তানের দারিদ্র্যপীড়িত পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া লাখ লাখ কন্যাশিশুর একজন। সেখানে চরম দারিদ্র্যের কারণে পরিবারগুলো টিকে থাকার জন্য, এমনকি নবজাতক মেয়েশিশুকেও বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২১ সালের শেষ দিকে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছিল, এমন বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট রয়েছে যেখানে পরিবারগুলো মাত্র ২০ দিন বয়সী মেয়েশিশুকেও ভবিষ্যৎ বিয়ের জন্য ‘দেনমোহর’ বা অর্থের বিনিময়ে দেয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যেখানে বাল্যবিবাহকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, সেখানে গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের তালেবান নতুন এক আইনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহকে

আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই আইনে ‘কুমারী মেয়েদের’ জন্য নির্দিষ্ট নিয়মাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, যদি সামাজিকভাবে উপযুক্ত বিবেচিত হয় এবং দেনমোহর ঠিক থাকে, তবে শিশুর সঙ্গে হওয়া বিয়ে আইনগতভাবে বৈধ। এছাড়া মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে চাইলে বিয়ে বাতিল করতে পারবে। আরও বলা হয়েছে, কুমারী মেয়ের নীরবতাকে বিয়েতে সম্মতি হিসেবে ধরা হবে। কিন্তু একই নীরবতা কোনো পুরুষ বা আগে বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে সম্মতি হিসেবে গণ্য হবে না। আফগানিস্তানে যেখানে নারীরা শাস্তির ভয়ে প্রায়ই মুখ খুলতে ভয় পান, সেখানে এই নতুন আইন অনেক মেয়েকে আরও বেশি বন্দি অবস্থায় ঠেলে দিতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আফগানিস্তানে আর্থিক লাভের জন্য কন্যাসন্তানকে বয়স্ক পুরুষদের কাছে বিক্রি করার প্রথা এখন দুঃখজনকভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশের প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই তাদের মৌলিক দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। বেকারত্ব ব্যাপক, স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত, আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সহায়তাও দ্রুত কমে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তারা একসময় আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় দাতা ছিল, তারা এখন প্রায় সব সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। বৃটেনসহ অন্যান্য দেশও একই পথে হাঁটছে। জাতিসংঘ বলছে, আফগানিস্তান এখন আগের বছরের তুলনায় ৭০ শতাংশেরও কম সহায়তা পাচ্ছে। এই মানবিক সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারীরা। বিবিসির একটি তথ্যচিত্রে দেখা যায়, অনেক পিতা স্বীকার করেছেন- তারা কেবল খাবারের জন্যই নিজেদের কন্যাসন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

আফগানিস্তানের ঘোর প্রদেশের আবদুল রশিদ আজিমি বলেন, তার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে তাকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমি ঘরে ফিরে আসি শুকনো ঠোঁট, ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর বিভ্রান্তি নিয়ে। আমার সন্তানরা আমাকে বলে- বাবা, আমাদের রুটি দাও। কিন্তু আমি কী দেব? কাজ কোথায়? জানান, তিনি এতটাই হতাশ যে তার সাত বছর বয়সী যমজ দুই মেয়ে রোকিয়া বা রোহিলা-এর একজনকে বিক্রি করতে হতে পারেন। বলেন, আমি যদি এক মেয়েকে বিক্রি করি, তবে বাকি সন্তানদের অন্তত চার বছর খাওয়াতে পারব। হৃদয় ভেঙে যায়, কিন্তু এটাই একমাত্র উপায়।

এমন পরিস্থিতিতে তিনিই একমাত্র নন। সাঈদ আহমদ বলেন, তিনি ইতিমধ্যে তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে শায়কাকে বিক্রি করে দিয়েছেন। কারণ তার অ্যাপেন্ডিসাইটিস ও লিভারে সিস্ট হয়েছিল। চিকিৎসার খরচ জোগানোর টাকা না থাকায় তিনি আত্মীয়ের কাছেই মেয়েকে বিক্রি করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তালেবান একটি নতুন দণ্ডবিধি চালু করে, যেখানে নারীদের এক ধরনের ‘দাস’ হিসেবে গণ্য করার মতো কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। এই আইনে স্বামীদের অনুমতি দেয়া হয়েছে যে, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি না হলে তারা স্ত্রীকে মারধর করতে পারবে। এই আইন তরুণী বধূদের বয়স্ক ও শক্তিশালী পুরুষদের সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলছে।

সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে আলোচিত পরওয়ানা মালিকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার পিতা আবদুল তাকে খাবারের টাকার জন্য কোরবান নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন। আবদুল কান্নায় ভেঙে পড়ে অনুরোধ করেন যেন মেয়েটিকে আঘাত না করা হয়। পরওয়ানার মুখ হালকা গোলাপি হিজাবের আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছিল। সে সিএনএন’কে বলে, আমার বাবা আমাকে বিক্রি করেছে। কারণ আমাদের রুটি, চাল বা আটা নেই। আমাকে এক বৃদ্ধ মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

আবদুল আগে তার আরেক ১২ বছর বয়সী মেয়েকেও পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য বিক্রি করেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা আটজনের পরিবার। অন্যদের বাঁচিয়ে রাখতে আমাকে বিক্রি করতে হয়। কোরবান দাবি করেন, তিনি পরওয়ানাকে নিজের সন্তানের মতো রাখবেন এবং তার আগে থেকেই স্ত্রী রয়েছে। তিনি বলেন, ও ছিল খুব সস্তা। কারণ ওর বাবা খুব গরিব এবং টাকার প্রয়োজন ছিল। তিনি আরও বলেন, সে আমার বাড়িতে কাজ করবে। আমি ওকে মারব না। পরিবারের মতোই রাখব।

কিন্তু আবদুল বলেন, এখন তার মেয়ের ওপর কী ঘটছে তা নিয়ে তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি স্মরণ করেন, ওই ব্যক্তি তাকে বলেছিল- আমি মেয়েটার বিপরীতে টাকা দিচ্ছি। এখন সে আমার ব্যাপার, তুমি আর এতে জড়িত নও।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ‘টু ইয়ং টু ওয়েড’ মেয়েটিকে ওই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করে। পরে তার পরিবারকে হেরাতের একটি নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তারা প্রথমবারের মতো তাঁবুর বাইরে একটি ঘরে থাকতে পারে।

কোরবানও পরে জনচাপের কারণে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। তবে সব শিশু এতটা সৌভাগ্যবান নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দরিদ্র পরিবারগুলো ভবিষ্যৎ বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এমনকি নবজাতক মেয়েশিশুকেও বিক্রি করছে। আফগান নারী অধিকারকর্মী ওজমা ফ্রোগ বলেন, এই গল্পগুলো শুনে হৃদয় ভেঙে যায়। এটা বিয়ে নয়, এটা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন। তিনি বলেন, প্রায় দিনই এমন ঘটনা শোনা যায়। অনেক সময় দশ বছরের কম বয়সী মেয়েদেরও এতে জড়ানো হয়।

গত বছর তালেবান দুই ব্যক্তি একজন ছয় বছর বয়সী মেয়েকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছিল। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। বরং স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, মেয়েটির বয়স নয় বছর না হওয়া পর্যন্ত বরের অপেক্ষা করতে বলা হয়। আফগানিস্তান পুনরায় ক্ষমতা নেওয়ার পর তালেবান মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর পড়াশোনা নিষিদ্ধ করেছে এবং নারীদের কাজ ও চলাচলে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

ফেব্রুয়ারিতে চালু হওয়া নতুন দণ্ডবিধিতে নারীদের বিরুদ্ধে মানসিক বা শারীরিক সহিংসতার নিন্দা বা নিষেধাজ্ঞা নেই। এছাড়া, নারীরা সহিংসতা থেকে বাঁচতে পরিবারের আশ্রয়ে ফিরে যাওয়ার অধিকারও হারিয়েছে। আইনের ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নারী যদি বারবার স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাবার বাড়ি বা আত্মীয়ের বাড়িতে যায় এবং স্বামীর অনুরোধে ফিরে না আসে, তাহলে তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়া হবে। এছাড়া তার পরিবার ও আত্মীয়দেরও শাস্তির মুখে পড়তে হবে। যদিও এই শোষণের প্রধান শিকার মেয়েশিশুরা, আফগানিস্তানে ছেলেশিশুরাও তালেবান শাসনের নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে। অনেককে বড়দের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার করা হয় এবং ক্ষমতাবানদের বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা হয়।

এই প্রথা ‘বাচ্চা বাজি’ নামে পরিচিত। যার অর্থ ‘ছেলে খেলানো’। এতে অল্প বয়সী ছেলেদের সাজগোজ করিয়ে নাচানো হয় এবং ক্ষমতাশালীদের সামনে বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা এই প্রথা এখনো আফগানিস্তানে বিদ্যমান। তালেবান প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করলেও বাস্তবে এটি গোপনে চলতে থাকে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাচ্চা বাজির মাধ্যমে ছেলেরা বাণিজ্যিক যৌন শোষণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে এবং এটি প্রায়ই রিপোর্ট করা হয় না ভয়ের কারণে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তালেবান দাবি করলেও বাস্তবে এই প্রথা এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান এবং কার্যকরভাবে বন্ধ হয়নি। যারা এই নির্যাতন থেকে বেঁচে পালিয়ে আসে, তারা মারধর, ধর্ষণ ও মানসিক ট্রমার কথা বলে। বড় হয়ে গেলে তাদের আর প্রয়োজনীয় মনে না হওয়ায় সমাজ থেকে ছুড়ে ফেলা হয়।

অনেকে পরে মাদকাসক্তি, পতিতাবৃত্তি বা আত্মহত্যার দিকে চলে যায়। কারণ তারা সেই ট্রমা থেকে বের হতে পারে না। যদিও কিছু ছেলে স্বেচ্ছায় এতে যুক্ত হয় বলে দাবি করা হয়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদেরকে দরিদ্র পরিবার বিক্রি করে দেয় বা বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অনেককে আবার অপহরণও করা হয়- এমনকি পুলিশের হাতেও, যারা এই প্রথা বন্ধ করার দায়িত্বে থাকার কথা।

ট্যাগসমূহ:

নজিবুল ইসলাম

১ মাস আগে

এই যদি সত্যই হয় তাহলে কিসের মুসলিম মুসলিমদের আদর্শ হতে অভাবে অসহায় মানুষদের দান করা কিন্তু এ খবরে দেখা যাচ্ছে অর্থশালীরা অর্থ দিয়ে অসহায় মানুষদের কন্যাদের ক্রয় করে বিবাহ নামে যৈন
আকাঙ্ক্ষা পূরণ এরা অসহায় এতিম কন্যাদের নিজের মেয়ে ভাবতে পারে না এরা কখনো মুসলিম হতে পারে না। যে দেশে আল্লাহর কোরআন ও রাসূলের হাদিস কে বিকৃতি করা হয়েছে মহান আল্লাহ যেন আমাদের বাংলাদেশে এই জালিম শাসক যেন না আসে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।

মিলন আজাদ

১ মাস আগে

মধ্যযুগীয় বর্বরতা।

Abdul Aziz

১ মাস আগে

Be happy❤️Bangladesh comming soon.

আনিস উল হক

১ মাস আগে

এই কুপমন্ডুক শাসকদের মত শাসকরা কখনো যেন বাংলাদেশে না আসতে পারে - এবিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে।

মন্তব্য করুন