গাইবান্ধার সাঘাটায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে একটি সড়ক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্ষার আগে তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) যোগসাজশে এই লুটপাট হচ্ছে। সরজমিন দেখা যায়, সাঘাটা উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের সামির উদ্দিনের বাড়ি থেকে আলাই নদী পর্যন্ত এক হাজার মিটার দীর্ঘ ও তিন মিটার প্রস্থের হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) রাস্তাটির নির্মাণকাজ চলছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪৮ টাকা। প্রতি বর্গমিটারে খরচ দাঁড়াচ্ছে ২,৭২২.৯৪ টাকা।
অভিযোগ উঠেছে, রাস্তায় অত্যন্ত নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। বাঙালি নদী থেকে তোলা কাদাযুক্ত ময়লা বালু বেডে ফেলা হচ্ছে। কোনো প্রকার রোলার বা কমপ্যাকশন ছাড়াই আলগা বালুর ওপর ইটের সলিং বসানো হচ্ছে। মানুষ যেন অনিয়ম টের না পায়, সেজন্য তড়িঘড়ি করে ওপর দিয়ে বালু ঢেলে দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় যুবক সাকিব আল হাসান বলেন, ভেকু দিয়ে মাটি কেটেই সমান না করে বালু ফেলা হয়েছে। ইটগুলো অনেক ফাঁকা করে বসানো হচ্ছে। এই রাস্তা এক বছরও টিকবে না। আরেক বাসিন্দা সাজু মিয়া জানান, ভালো রাস্তার আশায় থাকলেও কাজ হচ্ছে ‘গোলেমালে’। বাধা দিলেও কেউ শুনছে না।
সবজি বিক্রেতা ছায়দার রহমান জানান, নতুন রাস্তাটি আগের চেয়েও নিচু করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এটি ২/৩ ফুট উঁচু করার কথা ছিল। স্থানীয় কলেজছাত্র কাদের আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার যখন দেশ এগিয়ে নিচ্ছে, তখন কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদার লুটপাটে ব্যস্ত। তিনি এই কাজের তদন্ত দাবি করেন। কৃষিজীবী শ্রমিক আব্দুর রহমান জানান, স্থানীয় কোনো শ্রমিক না নিয়ে অন্য এলাকার লোক দিয়ে খুব ভোরে কাজ করানো হয়, যাতে স্থানীয়রা অনিয়ম ধরতে না পারে। কলেজছাত্র আশরাফুল ইসলামও রাস্তার স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইউপি সদস্য অভিযোগ করেন, সাঘাটা উপজেলা পিআইও ঘুষ ছাড়া কোনো প্রকল্প পাস করেন না। তিনি এই কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেন। কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খন্দকার বলেন, আমি বারবার ভালোভাবে কাজ করতে বলেছি। কিন্তু ঠিকাদার ও পিআইও অফিসের লোকজন কথা শোনে না। মাটি কাটার পর আর্দ্রতা পরীক্ষা ও কমপ্যাকশন করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি।
এতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে নির্মাণকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কাসেম ট্রেডার্সের ঠিকাদার মো. রেজাউল ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। উল্টো তিনি সংবাদিকদের রাস্তার ভিডিও করে প্রশাসনকে দেখানোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। পিআইও অফিসের কার্যসহকারী আপেল মাহমুদ অবশ্য কিছু ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমি আসার পর নিম্নমানের ইটগুলো সরিয়ে রাখতে বলেছি। এসব কাজে সামান্য ভুলত্রুটি হয়ই। অভিযোগ আমলে নিয়ে কাজ নিয়মের মধ্যে আনা হবে। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান। তিনি দাবি করেন, কাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল কবির জানান, রাস্তাটি পরিদর্শনের জন্য একটি কারিগরি (টেকনিক্যাল) টিম পাঠানো হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেছও সড়কটি সরজমিন পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। উপজেলা পিআইও অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৮১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪৮ টাকার এই প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে বালু ভরাট ১,৯৭,৪৯০ টাকা, ইটের এজিং ৪,৫৬,৯৭৫ টাকা, ইটের সোলিং ৫,০০,৬২০, হেরিং বোন বন্ড ১৮,৪৫,২৫০, ইটের কাজের সামগ্রী ২৯,৯৭,৫০০, শ্রমিক মজুরি ১১,৯৭,৬০৫, ড্রামশিট ক্রয় ৩০,৬৫০, বাঁশের খুঁটি ২০,০৭০ এবং ঘাস লাগানোর জন্য ৬১,৬০০ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
