তেলাপোকা জনতা পার্টির ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঘিরে নয়াদিল্লির রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গতকাল সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ব্যাপক নৃশংসতা চালায় দিল্লি পুলিশ। এতে পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে পড়ে। গতকাল ভারতীয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন বিরোধীদলীয় নেতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, প্রিয়াংকা গান্ধী। দলটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন। কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে আরও যোগ দেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি দমন-পীড়নের প্রতিবাদে সংসদে কথা বলার অনুমতি চান বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তাতে সায় দেননি স্পিকার। এর প্রতিবাদে রাহুলের নেতৃত্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লোক কল্যাণ মার্গের সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রের হুংকার উপেক্ষা করেই মোদির বাসভবনের অদূরে জড়ো হন তারা। কিন্তু তাদের উপরেও চড়াও হয়েছে পুলিশ। টেনে-হিঁচড়ে বিরোধীদলীয় নেতাদের বাসে তোলে দিল্লি পুলিশ। আটক করা হয় রাহুল, প্রিয়াংকা ও অখিলেশকে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে এমন বিক্ষোভের ঘটনা- এটাই প্রথম। বিক্ষোভের আগে এক্স পোস্টে মোদির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেন রাহুল। তিনি লেখেন, ‘শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মানে প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর হামলা। প্রধানমন্ত্রী মোদি মনে করেন, তিনি কোনো জবাব না দিয়েই, কোনো পরিণতির মুখোমুখি না হয়েই পার পেয়ে যাবেন- পারবেন না, এবার তো একেবারেই না। আমি প্রত্যেক দেশপ্রেমিক ভারতীয়ের কাছে আবেদন জানাই, যিনি বিশ্বাস করেন যে, আমাদের শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার পাওয়া উচিত- প্রধানমন্ত্রী বাসভবনের সামনে আমাদের বিক্ষোভে যোগ দিন। ভারতের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করা যায় না।’
সোমবার সংসদ অভিমুখে মিছিল চলাকালে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপের জেরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেছেন কংগ্রেস নেতারা। পুলিশের প্রতিক্রিয়াকে ‘অ-ভারতীয়’ আখ্যা দিয়ে রাহুল বলেছেন, শিক্ষার্থীদের আরও ভালো ব্যবহার প্রাপ্য। বিক্ষোভে যাওয়ার আগে সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন- ন্যায্য উদ্বেগ প্রকাশকারী শিক্ষার্থীদের দমন করতে কেন্দ্র পুলিশি শক্তি ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, ‘সারা দেশ জানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর কোনো অস্তিত্বই নেই। পরীক্ষা ব্যবস্থা উইপোকা দ্বারা ফাঁপা হয়ে গেছে। তারা শুধু এটাই বলছে। আমরাও এটা বলে আসছি। আমি এই বিষয়ে একের পর এক প্রেজেন্টেশন দিয়ে আসছি। প্রধানমন্ত্রী কেন চুপ, এই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
কংগ্রেস সংসদ সদস্য সৈয়দ নাসির হুসেন বলেছেন, সরকার চেয়েছিল আমরা যেন প্রতিবাদ বিক্ষোভ তুলে নিই, কিন্তু আমাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় আমরা তাতে রাজি হইনি। আমরা চাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করুন এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে সংসদে আলোচনা হোক। কংগ্রেস চারটি দাবিতে রাতভর বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পাশাপাশি, পুলিশি দমন-পীড়নের দায় স্বীকার করে সরকারের ক্ষমাপ্রার্থনা, সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি নিয়ে বাদল অধিবেশনে আলোচনার দাবি জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই দাবি মানার বার্তা দেয়নি মোদি সরকার। গতকালের বিক্ষোভে কংগ্রেস সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি দুই কংগ্রেস শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেরলের ভিডি সতীশন এবং কর্ণাটকের ডিকে শিবকুমারও যোগ দেন।
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা: এদিকে মোদি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডার সঙ্গে বৈঠকের পরেও নিজেদের অবস্থানে অটল থাকার কথা জানিয়েছে তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সোনম ওয়াংটুকও হাসপাতালে অনশন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। সিজেপি আরও জানিয়েছে, সরকারের কাছে তারা মূলত তিনটি দাবি জানিয়েছে। সেগুলো হলো, সোনম ওয়াংচুকের হাসপাতাল থেকে মুক্তি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে আত্মহত্যা করা প্রায় একডজন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের পরিবারকে এককোটি রুপি ক্ষতিপূরণ প্রদান। সেই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা যেভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল, তেমনই চলবে বলে জানিয়েছেন।
দিল্লিমুখী কৃষক মিছিলে পুলিশি বাধা: এদিকে মোদির সরকারের বিরুদ্ধে কৃষকরাও আন্দোলনে নেমেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে কিষাণ মহাপঞ্চায়েতে যোগ দিতে গতকাল দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তবে তাদের হরিয়ানার শম্ভু সীমান্তে আটকে দেয় স্থানীয় পুলিশ। হরিয়ানায় প্রবেশের প্রধান এই সীমান্তে পুলিশের ব্যারিকেড বসানোর দৃশ্য ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির ‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় কৃষকদের দিল্লিতে প্রবেশ ঠেকাতে কংক্রিটের ব্লক, লোহার কাঁটা এবং বহুস্তরবিশিষ্ট ব্যারিকেড দিয়ে পুরো সীমান্তকে দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, দিল্লিতে যেতে বাধা দেয়ায় কৃষকরা শম্ভু সীমান্তেই অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, হরিয়ানা ও পাঞ্জাব উভয় রাজ্য সরকারই রাজধানীতে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার দমনের চেষ্টা করছে। বিকেইইউ শহীদ ভগৎ সিংয়ের নেতা তেজবীর সিং অভিযোগ করেন, হরিয়ানা পুলিশ পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরেই ব্যারিকেড স্থাপন করেছে। তার দাবি, এ বিষয়ে পাঞ্জাব সরকার কোনো প্রতিবাদ না জানিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। তবে পাঞ্জাবের কৃষকদের আটকে দেয়া হলেও, হরিয়ানার আম্বালা, কুরুক্ষেত্র ও আশপাশের জেলার কৃষকরা দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি: দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে আয়োজিত এই মহাপঞ্চায়েতে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের কৃষক সংগঠনগুলো অংশ নিয়েছে। তাদের প্রধান দাবি, কেন্দ্র সরকার যেন প্রস্তাবিত ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসে। কিষাণ-মজদুর সংঘর্ষ কমিটির (কেএমএসসি) নেতা সরওয়ান সিং পান্ধের বলেন, কেএমএসসি, কিষাণ-মজদুর মোর্চা (পাঞ্জাব), আজাদ কিষাণ মোর্চা এবং বিকেইইউ একতা সংঘর্ষের মিছিল পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকা থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু শম্ভু সীমান্তে পৌঁছানোর পর তাদের থামিয়ে দেয়া হয়।
কৃষকদের উদ্বেগ: পান্ধের বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ভারত-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বিবৃতিতে এ বছরের শরৎকাল নাগাদ বহুখাতভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রথম ধাপ নিয়ে আলোচনা শেষ করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তার দাবি, এটি শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি নয়। এর আওতায় কৃষি, দুগ্ধ, শিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয়, মেধাস্বত্ব এবং সেবাখাত নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
