মালদ্বীপের ভাভু অ্যাটলের গভীর সমুদ্রগুহা থেকে প্রকাশিত নতুন ছবিতে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর এক পানির নিচের গোলকধাঁধার চিত্র। যেখানে প্রবেশ করে প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন ডুবুরি। মালদ্বীপের স্মরণকালের ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক উদ্ধার অভিযানে পরিচালিত হয়। অভিযান পরিচালনার পর সেখানের ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত ছবিগুলোতে সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ, খাড়া খাদ এবং কাদামাটিতে ভরা কক্ষ দেখা গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০ মিটার গভীরে অবস্থিত এই গুহা। ঘটনাটি শুরু হয় ১৪ মে, যখন পাঁচজন ইতালীয় ডুবুরি আলিমাথা দ্বীপের কাছে অবস্থিত ‘শার্ক কেভ’ নামে পরিচিত গুহায় অভিযানে নামেন। নিখোঁজ ডুবুরিদের মধ্যে ছিলেন সামুদ্রিক পরিবেশবিদ্যার অধ্যাপক মনিকা মন্টেফালকোনে, তার ২০ বছর বয়সী মেয়ে জর্জিয়া সোম্মাকাল, সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ফেদেরিকো গুয়ালতিয়েরি, গবেষক মুরিয়েল অদেনিনো এবং ডাইভিং প্রশিক্ষক জিয়ানলুকা বেনেদেত্তি। কর্তৃপক্ষ জানায়, ডুবুরিরা মালদ্বীপে বিনোদনমূলক ডাইভিংয়ের নির্ধারিত ৩০ মিটার সীমার অনেক নিচে নেমে যান। তদন্তকারীদের ধারণা, তারা ৫০ থেকে ৬০ মিটার গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন।
সেখানে তারা মানচিত্রবিহীন জটিল গুহা নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেন। নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ পর গুহার প্রবেশমুখের কাছে জিয়ানলুকা বেনেদেত্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে বাকি চারজন ডুবুরি কয়েকদিন ধরে গুহার গভীরে আটকে ছিলেন। অন্ধকারাচ্ছনতা, শক্তিশালী পানির স্রোত এবং অতিরিক্ত গভীরতার কারণে নিহতদের উদ্ধার অভিযান বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। উদ্ধার অভিযানের সময় মালদ্বীপের সেনাবাহিনীর ডুবুরি সার্জেন্ট মোহাম্মদ মাহুদি ডিকম্প্রেশন অসুস্থতায় মারা যান। এর ফলে এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ছয়ে। পরে ফিনল্যান্ডের বিশেষজ্ঞ গুহা-ডুবুরিরা উন্নত প্রযুক্তির রিব্রিদার যন্ত্র ব্যবহার করে ভেতরে প্রবেশ করে গুহার সবচেয়ে ভেতরের কক্ষ থেকে বাকি মরদেহগুলো উদ্ধার করেন। উদ্ধারকারীরা জানান, ডুবুরিরা সম্ভবত একটি বন্ধ সুড়ঙ্গে ঢুকে দিক হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই সময় গুহার তলদেশের কাদামাটি ছড়িয়ে পড়ে পানি ঘোঁলাটে হয়ে যায়।
এতে দৃষ্টিশক্তির তীব্র ব্যাঘাত ঘটে। ইউরোপীয় ডাইভিং নিরাপত্তা সংস্থা ড্যান ইউরোপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লরা মারোনি জানিয়েছেন, মালদ্বীপের সমুদ্রগুহায় প্রাণ হারানো ইতালীয় ডুবুরিরা সম্ভবত বের হওয়ার সময় ভুল পথে চলে গিয়েছিলেন। যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ ছিল না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, গুহার একটি চেম্বারে জমে ওঠা বালুর স্তূপ দূর থেকে দেয়ালের মতো দেখাতে পারে। এতে ডুবুরিদের সামনে এক ধরনের দৃষ্টিভ্রম তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই বিভ্রান্তির কারণেই তারা বের হওয়ার পথের বদলে একটি অচল সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েন। লরা মারোনি ইতালীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ডুবুরিরা প্রায় ১২ লিটার ধারণক্ষমতার অক্সিজেন ট্যাংক ব্যবহার করছিলেন। তার হিসাব অনুযায়ী, ওই ট্যাংকে মাত্র ১০ মিনিট চলার মতো বাতাস ছিল। তিনি আরও বলেন, যখন বুঝতে পারবেন যে আপনি ভুল পথে চলে গেছেন এবং খুব সামান্য বাতাস আছে, তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আতঙ্কে শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যায় এবং বাতাস আরও দ্রুত শেষ হতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর পানির গুহায় সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও প্রাণঘাতী হতে পারে। সংকীর্ণ পথ, শূন্যের কাছাকাছি দৃশ্যমানতা এবং সীমিত অক্সিজেন মিলিয়ে ডুবুরিরা চরম বিপদের মুখে পড়েছিলেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে উদ্ধার হওয়া গোপ্রো ক্যামেরার ভিডিও এবং ডাইভিং কম্পিউটারের তথ্য বিশ্লেষণ করছে তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডাইভ জাহাজটির পরিচালনা লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে মালদ্বীপ কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা বিধি ও অনুমতির নিয়ম ভঙ্গ করা হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
