আস্থার সংকটে আলোচনা

ডনের সম্পাদকীয়

আস্থার সংকটে আলোচনা

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা একের পর এক দোলাচলে কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান এখনো বহু দূরে। বিশেষ করে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে বিভ্রান্তি কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। রয়টার্স বৃহস্পতিবার জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ দেশের ভেতরেই রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান দাবির সরাসরি বিপরীত। তবে ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পরে দাবি করেন, এমন কোনো নতুন নির্দেশ দেয়া হয়নি। তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত আছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নজরদারির অধীনে দেশের ভেতরেই তারা নিষ্ক্রিয় করতে রাজি আছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল চায় ওই মজুদ বিদেশে স্থানান্তর করা হোক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাবেন বলেছেন। ইরান যুক্তি দিচ্ছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো হলে দেশটি ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। এই মতবিরোধই আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।

ইসলামাবাদকে অবিশ্বাস তেহরানের:

আলোচনা যখন চলছে তখন আস্থার সংকটের বিষয়টিও উঠে এসেছে বিশ্লেষকদের মতামতে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সন্দেহ করে তেহরান। আবার ইসলামাবাদও ইরানকে সন্দেহ করছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করায়। এই বাস্তবতায় আলোচনা শুধু ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়ে আটকে নেই। এটি মূলত আস্থার সংকট বা আস্থার অভাবকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা ক্রমেই সন্দেহ করছেন যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি হয়তো নতুন হামলার আগে কেবল একটি কৌশলগত বিরতি। তেহরান সঠিক উত্তর না দেয় তবে সামরিক পদক্ষেপ আবার শুরু হতে পারে ট্রাম্পের এমন হুঁশিয়ারি এই শঙ্কা আরও বাড়িয়েছে। এর জবাবে ইরানও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, নতুন হামলা হলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে তেহরান এটিও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেলে আলোচনা সম্ভব।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির বারবার তেহরান সফর ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসলামাবাদ সরাসরি কূটনীতি শুরুর আগেই আলোচনার ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ইরান সফরের খবরেও বোঝা যাচ্ছে, মধ্যস্থতার উদ্যোগ এখন পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তবে ইসলামাবাদ একটি জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ইরানের সন্দেহ কাটছে না। আবার ভারতকে নিয়ে তেহরানের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও পাকিস্তান অস্বস্তিতে আছে। এদিকে সংকট ভৌগোলিকভাবে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। উপসাগরীয় অবকাঠামোর কাছে ড্রোন হামলার ঘটনা এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার ফলে বোঝা যাচ্ছে, সামান্য উত্তেজনাও এখন বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য যেমন কৌশলগত চাপের হাতিয়ার, তেমনি এটি উপসাগরীয় দেশ ও জ্বালানি বাজারের জন্য বড় উদ্বেগ। সৌদি আরব পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকে সমর্থন করছে কারণ দীর্ঘ অনিশ্চয়তা আঞ্চলিক অর্থনীতি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চীন ও রাশিয়াও এখন আরও সরব হচ্ছে। তারা একতরফা সামরিক পদক্ষেপ ও বাইরের চাপের মাধ্যমে সমাধান চাপিয়ে দেয়ার নীতির সমালোচনা করেছে।

বেইজিং উপসাগরীয় বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছে, আর মস্কো এটিকে ক্রমশ সংঘাতমুখী বৈশ্বিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে। উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে গেলেও তারা নীরবে নতুন সংঘাতের প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন