গাজার উদ্দেশে যাত্রা করা সহায়তাবাহী ফ্লোটিলার ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীদের সঙ্গে ইসরাইলের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দা দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদ জানাতে বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, স্পেন সহ বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে। মন্ত্রীর ওই আচরণের নিন্দা জানাতে বাধ্য হয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে তাকে হাত বাঁধা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসে থাকা কর্মীদের ব্যঙ্গ করতে দেখা যায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও কানাডাসহ একাধিক দেশ এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তার এই আচরণের সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও।
নেতানিয়াহুর এমন সমালোচনা বিরল। তিনি বলেন, এ আচরণ ইসরাইলের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’য় অংশ নেয়া ৪০টির বেশি দেশের ৪৩০ জন কর্মীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি অধিকার সংগঠন তাদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি জানিয়েছে। অল্প পরিমাণ সহায়তা বহনকারী ফ্লোটিলাটি যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার ফিলিস্তিনিদের কঠিন পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই যাত্রা শুরু করে। তবে ইসরাইল এটিকে হামাসের পক্ষে সাজানো জনসংযোগ ‘স্টান্ট’ বলে আখ্যা দেয়। গত বৃহস্পতিবার তুরস্ক থেকে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার অংশ হিসেবে ৫০টির বেশি নৌযান যাত্রা শুরু করে। সোমবার সকালে সাইপ্রাসের পশ্চিমে আন্তর্জাতিক জলসীমায়, গাজার উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে, ইসরাইলি নৌ কমান্ডোরা বহরটিকে আটক করা শুরু করে। গাজার ওপর দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলি সামুদ্রিক অবরোধ চলছে।
ফ্লোটিলার আয়োজকদের দাবি, মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে সব নৌযান আটক করা হয়। এর মধ্যে একটি জাহাজ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ৮০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। তারা অভিযোগ করে, ইসরাইল আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবৈধ আগ্রাসন চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি কমান্ডোরা ছয়টি নৌযানে গুলি চালায়, জলকামান ব্যবহার করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে একটি জাহাজে ধাক্কা দেয়। তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সরাসরি কোনো গুলি ব্যবহার করা হয়নি। তারা জোর দিয়ে বলে, গাজার বৈধ নৌ অবরোধ ভাঙার কোনো চেষ্টা ইসরাইল মেনে নেবে না। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সব কর্মীকে ইসরাইলি জাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং ইসরাইলে পৌঁছানোর পর তারা নিজ নিজ কনস্যুলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন।
বুধবার সকালে ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন আদালাহ জানায়, কর্মীদের সম্পূর্ণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসরাইলি ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আশদোদ বন্দরে আটক রাখা হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, আমাদের আইনি দল এই আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করবে এবং সব ফ্লোটিলা অংশগ্রহণকারীর অবিলম্বে মুক্তি দাবি করবে।
ওদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা বেন-গাভির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী হিসেবে ইসরাইলি পুলিশের তত্ত্বাবধান করে। বুধবার বিকেলে সে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে। ভিডিওটির ক্যাপশন ছিল- ‘ইসরাইলে স্বাগতম’। ভিডিওতে দেখা যায়, সে আশদোদ বন্দরের একটি আটককেন্দ্র পরিদর্শন করছে। সেখানে ফ্লোটিলার কর্মীদের রাখা হয়েছে। এক পর্যায়ে তাকে নিরাপত্তাকর্মীদের উৎসাহ দিতে দেখা যায়, যখন তারা ‘ফ্রি, ফ্রি, প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেয়া এক নারী কর্মীকে জোর করে নিচে চেপে ধরছিল। এরপর বেন-গাভিরকে বড় একটি ইসরাইলি পতাকা নাড়াতে দেখা যায়, পাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা বহু কর্মীর হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় তখন। হিব্রু ভাষায় সে বলে, ‘ইসরাইলে স্বাগতম। আমরাই এখানকার মালিক।’
আরেক দৃশ্যে কয়েকজন কর্মীকে একটি জাহাজের ডেকে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখা যায়। আর পেছনে বাজছিল ইসরাইলের জাতীয় সংগীত। বেন-গাভিরের আচরণকে ‘জঘন্য’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। বৃটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, ভিডিওটিতে ‘চরম লজ্জাজনক দৃশ্য’ দেখা গেছে। তিনি জানান, ‘জরুরি ব্যাখ্যা’ দাবি করে ইসরাইলি দূতাবাসকে তলব করা হয়েছে। এর আগে তিনি বলেন, ঘটনায় জড়িত কয়েকজন বৃটিশ নাগরিকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং তাদের কনস্যুলার সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইসরাইলের আচরণকে ‘ঘৃণ্য’ বলে বর্ণনা করেন এবং জানান, ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তলবের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এক্সে দেয়া পোস্টে কার্নি বলেন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মান সব জায়গায়, সবসময় বজায় রাখতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ংও বেন-গাভিরের নিন্দা করে বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের আচরণ ছিল ‘অপমানজনক’। অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও স্পেন জানিয়েছে, বেন-গাভিরের আচরণ ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ এবং তারা নিজ নিজ দেশে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে।
আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলেন ম্যাকএন্টি বলেন, ভিডিওতে দেখা গেছে ‘অবৈধভাবে আটক’ অংশগ্রহণকারীদের, যাদের মধ্যে আইরিশ নাগরিকও আছেন, তাদের সঙ্গে ‘কোনোভাবেই মর্যাদা বা সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা হয়নি’। আদালাহ বলেছে, ভিডিওটি প্রমাণ করে যে ইসরাইল কর্মীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অপমানের অপরাধমূলক নীতি প্রয়োগ করছে।
এক বিরল ঘটনায় ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও নিজের মন্ত্রিসভার সহকর্মীর সমালোচনায় যোগ দেন। এক্সে গিদেওন সার লিখেছেন, এই লজ্জাজনক প্রদর্শনের মাধ্যমে আপনি সচেতনভাবেই আমাদের রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছেন এবং এটি প্রথমবার নয়। জবাবে বেন-গাভির দ্রুত পাল্টা মন্তব্য করে। বলে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বোঝা উচিত, ইসরাইল আর কারও চাপে নতি স্বীকারকারী রাষ্ট্র নয়।
এরপর নেতানিয়াহুও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, হামাস-সমর্থক উসকানিমূলক ফ্লোটিলাকে আমাদের জলসীমায় প্রবেশ ও গাজায় পৌঁছাতে বাধা দেয়ার পূর্ণ অধিকার ইসরাইলের আছে। তবে মন্ত্রী বেন-গাভির যেভাবে কর্মীদের সঙ্গে আচরণ করেছেন, তা ইসরাইলের মূল্যবোধ ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি আরও জানান, ‘উসকানিদাতাদের’ যত দ্রুত সম্ভব দেশ থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছেন।
ফ্লোটিলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর্মীরা গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য খাদ্য, শিশু খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা বহন করছিলেন। গত অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাসের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও গাজার ২১ লাখ মানুষের বেশিরভাগই এখনো বাস্তুচ্যুত এবং ভয়াবহ মানবিক সংকটে। তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, গাজা সহায়তায় প্লাবিত। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে ১৫ লাখ টনের বেশি সহায়তা ও হাজার হাজার টন চিকিৎসা সরঞ্জাম সেখানে প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘ গত সপ্তাহে জানিয়েছে, নিরাপদ বিকল্প না থাকায় গাজার বহু বাস্তুচ্যুত পরিবার এখনো অতিরিক্ত গাদাগাদি করা তাঁবু বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সংস্থাটি বলেছে, বিশুদ্ধ পানির অনিয়মিত সরবরাহ এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে মৌলিক সেবাও সীমিত হয়ে আছে। ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রবও গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ আরও জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, ব্যাকআপ জেনারেটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানিতে বিধিনিষেধের কারণে মানবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও ইঞ্জিন তেলের মতো প্রয়োজনীয় উপকরণেরও ঘাটতি রয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে গাজায় প্রবেশের জন্য ইসরাইল যে মানবিক সহায়তার অনুমোদন দিয়েছিল, তার মাত্র ৮৬ শতাংশ শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পার হতে পেরেছে। বাকি সহায়তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার মধ্য দিয়ে গাজা যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় প্রায় ১২০০ জন নিহত হন এবং আরও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর জবাবে ইসরাইল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে ৭২ হাজার ৭৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

Harun al Rashid
২ মাস আগেএরা একটা অভিশপ্ত জাতির সদস্য। হেন নবী রসুল নাই যাঁদের এরা নিগৃত করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিছু আরব মুসলিমদেশ ও ভারতসহ পশ্চিমা মুসলিম বিদ্বেষী দেশসমূহের আস্কারায় এরা এখন মানব সভ্যতার জন্য হুমকি।