বৃটেনে প্রথম দর্শনেই বিয়ে বা ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে। চ্যানেল ৪-এর জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো এটি। এতে বেশ কয়েকজন নারী তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শুটিং চলাকালে অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও অনস্ক্রিন স্বামীরা তাদের ধর্ষণ করেন। এক্ষেত্রে অনেক স্বামী সীমা লঙ্ঘন করেন। তাদের ওপর চালান নৃশংসতা। এক নারী বলেছেন, তিনি একটি অসম্মতিসূচক যৌন আচরণের অভিযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, শো-এর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাদের সুরক্ষায় যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি। চ্যানেল ৪ বলেছে, সম্প্রচারের আগেই কিছু অভিযোগ সম্পর্কে তারা অবগত ছিল এবং ওই নারীদের অংশগ্রহণ করা সব এপিসোড তাদের স্ট্রিমিং সার্ভিসে আগে থেকেই ছিল। তবে সোমবার দুপুরে তারা জানায়, সব এপিসোড স্ট্রিমিং ও টেলিভিশন সম্প্রচার থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ‘এমএএফএস ইউকে’-এর সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলও বন্ধ করা হয়েছে।
এক নতুন ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি ওয়াচডগ সংস্থার প্রধান বলেন, এই শোয়ের ফরম্যাটে ‘উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি’ রয়েছে এবং তা ‘সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না।’ চ্যানেল ৪ আগেই বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানে বলেছিল, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অপ্রমাণিত এবং বিতর্কিত।
সোমবার বিবিসি এ খবর প্রকাশের পর চ্যানেল ৪-এর আউটগোয়িং চিফ কনটেন্ট অফিসার ইয়ান ক্যাটজ বলেন, তিনি এখনও তথ্যচিত্রটি দেখেননি। তবে অভিযোগগুলোকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তারা আগে অনুষ্ঠানটি দেখার পর প্রতিক্রিয়া জানাবেন।
পরবর্তীতে চ্যানেল ৪ জানায়, গুরুতর অভিযোগ পাওয়ার পর তারা গত মাসেই শোয়ের কল্যাণ ব্যবস্থার একটি বহিরাগত পর্যালোচনা শুরু করেছে।
প্রযোজনা সংস্থা সিপিএল-এর আইনজীবীরা বলেছেন, তাদের ওয়েলফেয়ার সিস্টেম ‘স্বর্ণমানের’ এবং শিল্পে শীর্ষ পর্যায়ের। তারা সব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কাজ করেছে। বৃটেনের সংস্কৃতি, মিডিয়া ও ক্রীড়া দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, অভিযোগগুলো গুরুতর এবং টেলিভিশন সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বদা সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করতে হবে। অফকম জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী সম্প্রচারকদের দায়িত্ব হলো অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যারা ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। তারা চ্যানেল ৪-এর চলমান পর্যালোচনার ফলাফল দেখার অপেক্ষায় আছে।
‘ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ একটি ‘সামাজিক পরীক্ষা’ হিসেবে প্রচারিত রিয়েলিটি শো। সেখানে অপরিচিত মানুষরা প্রথম দেখা হওয়ার পরই ‘বিয়ে’ করে। শোতে দেখা যায়, দম্পতিরা হানিমুনে যায়। পরে একসঙ্গে বসবাস করে এবং সম্পর্ক গড়ে তোলে। সবই ক্যামেরার সামনে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা তিন নারীর অভিযোগ, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাদের যথাযথভাবে সুরক্ষা দেয়নি। একজন নারী বলেন, তার অনস্ক্রিন স্বামী তাকে ধর্ষণ করেন এবং অ্যাসিড হামলার হুমকি দেন। তিনি এখন আইনি পদক্ষেপ নিতে চান। দ্বিতীয় নারী বলেন, সম্প্রচারের আগে তিনি চ্যানেল ৪ ও সিপিএলকে ধর্ষণের অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তবুও তার পর্বগুলো প্রচার করা হয়। তৃতীয় নারী অনস্ক্রিন স্বামীর বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছেন।
একজন নারী, যাকে প্রতিবেদনে ‘লিজি’ (ছদ্মনাম) বলা হয়েছে, তিনি জানান শুরুর দিকেই অনস্ক্রিন স্বামীর আচরণে ‘লাল সংকেত’ দেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘হানিমুনে’ তার স্বামী প্রায়ই ব্যক্তিগতভাবে রাগের বিস্ফোরণ ঘটাতেন। তিনি আরও বলেন, তিনি স্বামীকে জানিয়েছিলেন যে তিনি এবং তার সাবেক সঙ্গীর মধ্যে সহিংসতা ছিল। এতে তিনি ভীত হয়ে প্রযোজনা দলের কাছে অভিযোগ করেন। প্রযোজনা সংস্থার আইনজীবীরা দাবি করেন, স্বামী জানিয়েছিলেন যে তিনিই বরং সহিংসতার শিকার ছিলেন। লিজি জানান, পরে তারা যৌন সম্পর্কে জড়ান।
কিন্তু তা দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, আমি বারবার থামতে বলছিলাম। কিন্তু সে থামেনি। তিনি আরও বলেন, স্বামী তাকে হুমকি দিয়েছিলেন যে- তিনি যদি কাউকে জানান, তবে তার ওপর অ্যাসিড হামলা চালানো হবে। লিজি অভিযোগ করেন, এক রাতে তিনি তাকে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কে বাধ্য করেন। তিনি বলেন, আমি সম্পূর্ণ ভয় পেয়ে জমে গিয়েছিলাম। তিনি পরদিনই প্রযোজনা দলের কাছে বিষয়টি জানান। তবে আইনজীবীরা বলেন, তারা তখন বিষয়টি সম্মতিসূচক কঠোর যৌন সম্পর্ক হিসেবে বুঝেছিলেন।
লিজি পরে চ্যানেল ৪-এর মনোচিকিৎসকের সঙ্গেও কথা বলেন এবং ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন।
তার অনস্ক্রিন স্বামীর আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন সব সম্পর্কই ছিল সম্মতিসূচক। আরেক নারী ‘ক্লোই’ জানান, তিনি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তার স্বামী তার শরীরে অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ করেন এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে ‘না, থামো’ বলেন। তিনি বলেন, পরে এক ঘটনায় তিনি যৌন সম্পর্কে না বলতে চাইলেও তার স্বামী তা চালিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ক্যামেরার কারণে কিছু বলতে সাহস পাননি। তার স্বামী পরে দাবি করেন, সবকিছুই ছিল সম্মতিসূচক এবং তিনি কোনো ধরনের যৌন হয়রানি করেননি।
তৃতীয় নারী শোনা ম্যান্ডারসন বলেন, তার অনস্ক্রিন স্বামী যৌন সম্পর্কের সময় সীমা লঙ্ঘন করেন। প্রযোজনা সংস্থা পরে তাদের শো থেকে সরিয়ে দেয়। শোনা ম্যান্ডারসনের স্বামী অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন, সবকিছুই সম্মতিসূচক ছিল।
নারী অধিকার সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন রিয়েলিটি শোগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি কেউ স্পষ্টভাবে না বলে, তারপরও যৌন সম্পর্ক ঘটে, তা যৌন লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়তে পারে। চ্যানেল ৪ বলেছে, তারা অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীদের কল্যাণ তাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, শো চলাকালীন তাদের যথাযথভাবে সুরক্ষা দেয়া হয়নি এবং তারা গুরুতর মানসিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন।
