মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরের শেষ সকালে প্রবেশ করেন ঝোংনানহাইয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি কম্পাউন্ডে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে ট্রাম্প কম্পাউন্ডটির ভিতরে যত্নে রক্ষিত বাগানে হাঁটেন। সেখানে ফুটে থাকা গোলাপ দেখে তারা থামেন, আর ট্রাম্পকে শি গোলাপের বীজ পাঠানোর প্রস্তাব দেন। পরে দুই নেতা একসঙ্গে চা পান ও মধ্যাহ্নভোজ করেন এবং এরপর আলোচনা চালিয়ে যান। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। শি’কে ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেন, অন্য বিদেশি নেতাদেরও কি এই কম্পাউন্ডে স্বাগত জানানো হয়?
শি জবাব দেন, খুবই কম। শুরুতে আমরা এখানে কূটনৈতিক অনুষ্ঠানই করতাম না। পরে কিছু অনুষ্ঠান শুরু হলেও, তা এখনো অত্যন্ত বিরল। উদাহরণ হিসেবে, (রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট) ভ্লাদিমির পুতিন এখানে এসেছিলেন।
হোয়াইট হাউস বা ক্রেমলিনের সঙ্গে প্রায়ই তুলনা করা হয় ঝোংনানহাইয়ের। এটি চীনের সবচেয়ে গোপনীয় স্থানগুলোর একটি। বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটির পাশের শতাব্দীপ্রাচীন লাল দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই কম্পাউন্ড সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থাকে। মাত্র কয়েকজন মার্কিন প্রেসিডেন্টই কখনো এর ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন।
এই কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা অত্যন্ত কঠোর। চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্বে থাকা একটি বিশেষ সামরিক ইউনিট সেখানে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। অনলাইনে এ এলাকার ছবি ও মানচিত্রও কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
কেন শি ট্রাম্পকে এই গোপন বাগানে আমন্ত্রণ জানালেন
শুক্রবারের বৈঠকে শি নিজেই এই স্থান নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম বৈঠকে ফ্লোরিডায় নিজের মার-এ-লাগো এস্টেটে তাকে আতিথ্য দিয়েছিলেন। তারই প্রতিদান হিসেবে এবার তিনি ঝোংনানহাই বেছে নিয়েছেন। দুটি হ্রদের নাম থেকে ঝোংনানহাইয়ের নামকরণ হয়েছে। এটি শুধু কর্মস্থল নয়, বরং চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের আবাসস্থলও।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, শি ট্রাম্পকে বলেন, ঝোংনানহাই হচ্ছে সেই স্থান, যেখানে চীনের (কমিউনিস্ট) পার্টি ও কেন্দ্রীয় সরকারের নেতারা কাজ করেন এবং বসবাস করেন, আমিও তাদের মধ্যে একজন। তিনি আরও বলেন, ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা (কমিউনিস্ট পার্টি) এখানে আছি। চীনের নেতারা- মাও সেতুং, ঝৌ এনলাই, দেং শিয়াওপিং, জিয়াং জেমিন, হু জিনতাও এবং আরও অনেকে এখানে ছিলেন।
চীনা সম্রাটদের রাজকীয় উদ্যান ছিল ঝোংনানহাই
কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার কেন্দ্র হওয়ার বহু আগে, ঝোংনানহাই ছিল চীনা সম্রাটদের অবকাশযাপনের উদ্যান। তারা ফরবিডেন সিটি থেকে দূরে এখানে বিশ্রাম নিতেন। সফরের সময় শি কম্পাউন্ডের কয়েকটি প্রাচীন গাছ দেখিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। এর মধ্যে একটি গাছের বয়স প্রায় ৪৯০ বছর বলে তিনি জানান। শি ট্রাম্পকে বলেন, এই কম্পাউন্ডের অন্য জায়গাগুলোতে এমন গাছও আছে, যেগুলোর বয়স এক হাজার বছরের বেশি। এক পর্যায়ে তিনি গাছগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস ও স্থায়িত্বের কথা বলতে বলতে ট্রাম্পকে গাছ স্পর্শ করতেও উৎসাহ দেন। চারপাশের পরিবেশে ট্রাম্প স্পষ্টতই মুগ্ধ হন। হাঁটার সময় তিনি বলেন, চমৎকার জায়গা। আমার ভালো লেগেছে। এখানে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারতাম।
১৯১২ সালে চীনের সাম্রাজ্যিক শাসনব্যবস্থা পতনের পর ঝোংনানহাই প্রেসিডেন্টের বাসভবনে রূপান্তরিত হয়। পরে গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় এলে মাও সেতুং এটিকে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। দশকের পর দশক ধরে এখানে অফিস, আবাসন ও বিনোদন সুবিধা যোগ করে কম্পাউন্ডটি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক মন্দির, প্যাভিলিয়ন ও উদ্যানের অনেক কিছুই সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রায় ১৫০০ একরজুড়ে বিস্তৃত ঝোংনানহাই আজও চীনের রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এর আগে কয়েকজন মার্কিন প্রেসিডেন্টও এই কম্পাউন্ড সফর করেছেন।
১৯৭২ সালে চীন সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এখানে মাও সেতুংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেটিই ছিল দায়িত্বে থাকা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। পরে জর্জ ডব্লিউ বুশ তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের সঙ্গে ঝোংনানহাইয়ে প্রবেশ করেন। আর বারাক ওবামা ২০১৪ সালে সেখানে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। সে সময় দুই নেতা চীনের ইতিহাস এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন বলে জানা যায়।
