প্রায় এক দশকের মধ্যে দায়িত্বে থাকা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফরে ডনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং আগমন। শুধু এই কারণেই শীর্ষ বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সময়ের প্রেক্ষাপট একে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। মূলত এপ্রিল মাসে বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে তা পিছিয়ে যায়। এখন বৈঠকটি হচ্ছে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন করে শুল্ক উত্তেজনার ছায়ায়। একই সঙ্গে এমন এক সময়ে যখন চীনের প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য দুর্বল হয়ে পড়ছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে।
আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকবে বাণিজ্য। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই শুল্ককে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক বার্তা দেয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখে আসছেন। তার প্রশাসন চীনের কাছ থেকে মার্কিন পণ্যের আমদানি বাড়ানো, চীনে কার্যকর মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য স্বস্তি এবং আরেক দফা ক্ষতিকর শুল্কযুদ্ধ ঠেকানোর নিশ্চয়তা চাইছে বলে জানা গেছে। ব্যবসায়ী ও বাজার উভয়ই এই বৈঠকের দিকে ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখবে। বছরের পর বছর ধরে চলা শুল্কযুদ্ধ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ইতিমধ্যেই বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। সামান্য অগ্রগতিও অস্থির বিনিয়োগকারীদের কিছুটা আশ্বস্ত করতে পারে।
তবে এই বৈঠক শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আলোচনার ওপর বড় ছায়া ফেলেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাত এবং তা মার্কিন কৌশলের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করছে তার ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই এশিয়ার সংকটে আরও বেশি জড়িয়ে পড়ছে। ইরান যুদ্ধে এখন ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মনোযোগ ও সামরিক সম্পদের বড় অংশ ব্যয় করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেন আর কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে বেইজিংকে অনুরোধ জানাতে চায় ওয়াশিংটন। বিশ্বের বড় অংশের তেল সরবরাহ এই পথ দিয়েই হয়। চীন সেই ভূমিকা নিতে চায় কি না, তার ওপর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, সামরিক শক্তি মোতায়েন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে।
এখানেই বৈঠকটির বৃহত্তর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীন এখন আর শুধু উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। এটি ক্রমশ এমন এক বৈশ্বিক প্রভাবকেন্দ্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে, যা নিজ অঞ্চলের বাইরেও সংঘাত, বাজার এবং কূটনৈতিক ফলাফলকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। বেইজিং এখন গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাতগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং বিপুল অর্থনৈতিক প্রভাব অর্জন করেছে, এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে ক্রমেই চাপে পড়ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। সামরিক শক্তিতে এখনও যুক্তরাষ্ট্রই এগিয়ে এবং বৈশ্বিক প্রভাবেও তার অবস্থান অতুলনীয়। অন্যদিকে চীন এখনও ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যা হ্রাস এবং প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের অবিশ্বাসের মতো সমস্যার মুখোমুখি। কিন্তু আগের ট্রাম্প-শি বৈঠকগুলোর তুলনায় এবার বেইজিং অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে আলোচনায় বসছে। তাদের ধারণা, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য ধীরে ধীরে তাদের পক্ষেই ঝুঁকছে।
তাইওয়ান এখনও সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্থিরতার কেন্দ্র। গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত কোনো ইস্যুতে কোনো পক্ষই ছাড় দেবে বলে মনে হয় না। তবে উভয় পক্ষই বোঝে, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে সরাসরি সংঘাতে রূপ নিলে তার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই শীর্ষ বৈঠক বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। ওয়াশিংটন ও বেইজিং তাদের ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠা সম্পর্কের চারপাশে নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই ভবিষ্যতের বাণিজ্য, শুল্ক, সংঘাত এবং উদীয়মান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
