হাম নিয়ে সিলেটে অস্থিরতা বাড়ছে। মৃত্যুর মিছিল কমছে না। টিকা প্রদানের সময় ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত সিলেটে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩১ শিশু। মৃতদের মধ্যে ৪ জন হাম আক্রান্ত। বাকি ২৭ জনই উপসর্গ নিয়ে। সর্বশেষ গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৯২ জন। পরিসংখ্যান বলছে; সিলেটে গতকাল পর্যন্ত ১৪৭ জন হাম রোগী চিহ্নিত হয়েছেন। টিকা প্রদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার ২০ দিনের মাথায় উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ও রোগীর সংখ্যা বাড়ায় দুশ্চিন্তা বেড়েছে। কেন এই পরিস্থিতি প্রশ্ন করা হলে সিলেটের সিভিল সার্জন নাসির উদ্দিনের উত্তর হচ্ছে; টিকাদান কর্মসূচি শেষ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে হাম রোগী কমে আসবে।
প্রশ্ন ছিল- শিশুদের সাধারণত সর্দি, জ্বর হলেই কী হাম উপসর্গের বিবেচনায় নেয়া হয় কিনা। জবাবে তিনি জানালেন- জ্বরের সঙ্গে যাদের রেশ রয়েছে তাদেরই কেবল হাম উপসর্গ হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়। সূত্র বলছে; সিলেটে হাম পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল রোগীতে ভর্তি। একশ’ বেডের ওই হাসপাতালে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১১০ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। ৭টি পিআইসিইউ রোগীতে ভর্তি। এ হাসপাতালে হাম উপসর্গের সঙ্গে অন্তহীন লড়াই চলছে। ওসমানীর ৩২ নম্বর ওয়ার্ডকে হাম উপসর্গ ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। এ ওয়ার্ডেও রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না। ৫০ জন রোগী বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন। সিলেট বিভাগের অপর তিন জেলা মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে প্রতিদিনই গুরুতর অবস্থায় রোগী এনে ভর্তি করা হচ্ছে। এসব রোগীদের বেলায় এসডিইউ, পিআইসিইউ লাগছে। ওসমানীতে ১০ শয্যার পিআইসিইউ ও ৭ শয্যার এসডিইউ চালু আছে। হাম রোগ বেড়ে যাওয়া নিয়ে সিলেট বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রায়ই বৈঠক করছেন।
লাগাম টেনে ধরার পলিসি খুঁজছেন। এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- অনেক চিকিৎসক জ্বর হলেই হাম উপসর্গ বলে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে নিয়ে ভর্তি করে দেন। এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ থাকে। বিষয়টি ভালোভাবে পরীক্ষা করার জন্য চিকিৎসকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে করে আতঙ্কেও কিছু রোগী ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। তিনি জানান- হাম উপসর্গ নিয়ে সিলেটে এ পর্যন্ত হাজারের কাছাকাছি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। অথচ আক্রান্তের সংখ্যা দেড়শ’র মতো। এ ছাড়া হাম মহামারির পূর্বেও ওসমানীসহ সিলেটে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও প্রতিদিন ৪-৫ জন রোগীর মৃত্যু হতো। ফলে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়কে আরও গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেন ওই কর্মকর্তা। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদ হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- হাম উপসর্গের রোগী সবাই কিন্তু হাম আক্রান্ত না। অনেকেরই রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে। এ ব্যাপারে অবশ্যই সচেতন হতে হবে।
একইসঙ্গে টিকাদান কর্মসূচিকে সফল করতে হবে। তিনি বলেন- আগামী এক মাসের মধ্যে সিলেটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। এখন অবশ্য রোগী বেশি। ধীরে ধীরে সেটি কমে আসবে বলে জানান তিনি। এদিকে- গতকাল সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে হাম উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশু মারা গেছে। এরা হচ্ছে- কানাইঘাটের নাজিম উদ্দিনের মেয়ে হাফিজা আক্তার (২ বছর ৩ মাস), সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের বিলাল আহমদের মেয়ে রাইসা জান্নাত (১ বছর ৫ মাস) ও ছাতক উপজেলার তোফায়েল আহমদের মেয়ে আরিয়া জান্নাত (৮ মাস)।
গেল ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে আরও ৯২ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৩০ জন ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬ জন ভর্তি হয়েছেন। সকাল পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যে ২৯৭ জন ভর্তি রয়েছেন তার মধ্যে সর্বোচ্চ ১১০ জন আছেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫৫ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ জন ভর্তি রয়েছেন।
