ইরান কেন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে টার্গেট করছে?

আল জাজিরার প্রতিবেদন

ইরান কেন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে টার্গেট করছে?

ফন্ট সাইজ:

ইরানি কর্তৃপক্ষ সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিশেষভাবে টার্গেট করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে। পারস্য উপসাগরে ইরান বাদে বাকি দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতা রয়েছে। যুদ্ধে ইরান এ সব দেশেই হামলা চালিয়েছে। তবে একটি দেশে তারা সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে। তা হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।

ইরান আমিরাতে ২৮ শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা তাদের ইসরাইলে চালানো হামলার চেয়েও পরিমাণে বেশি। ইরান সতর্ক করে বলেছে, আবার যদি তেহরানে হামলা চালানো হয় তবে আরব আমিরাতে বিধ্বংসী হামলা চালানো হবে। ইরানের সামরিক সদর দপ্তর খাতাম আল আম্বিয়া আরব আমিরাতের নাম উল্লেখ করে কড়া বিবৃতি দিয়েছে। সেখানকার এক কর্মকর্তা ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে বলেন, আরব আমিরাত আমাদের আর প্রতিবেশি নয়। একই সঙ্গে তারা ইরানের শত্রুরাষ্ট্র বলে গণ্য হবে।

ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ডস করপসের (আইআরজিসি) কমান্ডাররা আমিরাতের নেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেন, ইসলামি বিশ্ব এবং মুসলিমদের সঙ্গে প্রতারণা করে দেশটি যেন নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্র এবং জায়োনিস্টদের অস্ত্র এবং সামরিক শক্তির আস্তানা না বানায়। তারা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সঙ্গে মিলিত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অনিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করে ইরান। আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ দ্বীপ নিয়েও কড়া বার্তা দেয় তারা। এর আগে এই দ্বীপে হামলা চালানো হয়। তবে ইরান এই হামলার দায় অস্বীকার করে।

কি বলছে আরব আমিরাত?
আরব আমিরাত সবসময় ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, ইরানের হামলার জবাবে তাদের পাল্টা হামলা চালানোর অধিকার রয়েছে। এমনকি তারা সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিতও দেয়। তারা ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শীতল করেছে। আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য, ইরানিদের ভিসা, মুদ্রা বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থগিত করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ১৭ মার্চ বলেন, ইরান যদি আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়, তাহলে তা ইসরাইলের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্ক আরও জোরদার করবে। যুক্তরাষ্ট্রে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান আমিরাতের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারতো। ইউএই’র সঙ্গে ইরানের বাৎসরিক ২০০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ছিলো। যা এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও আরব আমিরাত হঠাৎ করেই তেল রপ্তানির সর্ববৃহৎ সংস্থা ওপেক থেকে নিজেদের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেয়।

ইরানের দৃষ্টি আরব আমিরাতের উপর কেন?
দীর্ঘদিন ধরেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি। আবুধাবির বাইরে অবস্থিত আল-দাফরা বিমানঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা এবং উন্নত রাডার, গোয়েন্দা সরঞ্জাম মোতায়েন রয়েছে। এগুলোকে যুদ্ধের সময় টার্গেট করা হয়েছে বলে দাবি আইআরজিসির। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কো আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এই চুক্তিগুলোর পরিধি আরো বাড়াতে চান। বিশেষ করে সৌদি আরবকে এতে যুক্ত করতে চান। তবে গাজায় ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের কারণে এই প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত। ট্রাম্প সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে একজন বুদ্ধিমান নেতা হিসেবে প্রশংসা করেছেন। গত মাসে দেশটি ওপেক থেকে সরে যাওয়ার পর ট্রাম্প বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়তো নিজস্ব পথে এগোতে চাইছে। আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্রুত সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ইসরাইলের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস উপসাগরীয় দেশটিতে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে। বর্তমান যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইল সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েক ডজন সেনা পাঠিয়েছে, যা আরব বিশ্বের অন্য কোথাও করা হয়নি। মঙ্গলবার তেল আবিবে এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে আব্রাহাম চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের অসাধারণ সম্পর্কের কারণে। দেশটি আরও বলেছে, তাদের বৈদেশিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব একটি সম্পূর্ণ সার্বভৌম বিষয়।

তেহরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে এই বলে যে, আরব দেশগুলোর ভূখণ্ড ও আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব এবং আবু মুসা দ্বীপ নিয়ে। ১৯৭১ সাল থেকে দ্বীপগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রী রিম আল-হাশিমি গত মাসে ব্যাখ্যা করেন কেন তার দেশ যুদ্ধের সময় ইরানের হামলার টার্গেট হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করি। দুইশোর বেশি দেশের জাতিকে স্বাগত জানাই এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সাদরে গ্রহণ করি। তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোট এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ইরান তার সম্পদ ব্যয় করে ফেলেছে।

আরব আমিরাত কি সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছিল?
নিজেদের সম্পদ ও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সামরিক চুক্তির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধবিমানে সজ্জিত একটি শক্তিশালী বিমান বাহিনী রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর ইসরাইলি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুদ্ধবিমান ইরানের কেশম দ্বীপের একটি পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালিয়েছে। তবে দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলি আল-নুয়াইমি এ প্রতিবেদনকে ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দেন।

তিনি বলেন, আমরা যখন কিছু করি, তখন তা ঘোষণা করার সাহসও রাখি। তেহরান এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটকে দায়ী করে। আইআরজিসি জানায়, তারা বাহরাইনের জুফায়ের ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। কারণ তারা মনে করে এই মার্কিন ঘাঁটি থেকেই তাদের উপর হামলা চালানো হয়েছে।

এপ্রিলের শুরুতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে একটি যুদ্ধবিষয়ক অনুষ্ঠানে একটি ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হয়, যেটিকে চীনা তৈরি উইং লুং ড্রোন বলে দাবি করা হয়। এই মডেলটি আগে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্যবহার করেছিল। একই সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়তো যুদ্ধের সময় ইরানের ভূখণ্ডে হামলায় জড়িত ছিল। যদিও ইরানের সামরিক কমান্ডার ও রাজনীতিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কোনো হামলার জন্য দায়ী করেননি। তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেশটির দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে।

৮ এপ্রিল সকালে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলার জন্য দেয়া সময়সীমার কিছু আগে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এরপর ইরানি গণমাধ্যমে লাবান তেল শোধনাগারে হামলা এবং সিরি এলাকায় বিস্ফোরণের খবর ও ভিডিও প্রকাশিত হয়। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা এতে জড়িত নয়। এর কিছু পর আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ টেলিগ্রাম চ্যানেল ও অনলাইন মাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে আরব আমিরাত পরিচালিত ফরাসি নির্মিত মিগ যুদ্ধবিমানকে দক্ষিণ ইরানের আকাশে উড়তে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়। রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যাপকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, এসব হামলা আরব আমিরাতের যুদ্ধবিমানই চালিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকরা আরও দাবি করেন, গত মাসে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার একটি ভিডিওতে দেখা যায় আরব আমিরাতের যুদ্ধবিমান তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। কিন্তু সেখানে থাকা যুদ্ধবিমানগুলোর জাতীয় চিহ্ন ও নম্বর সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তারা এটিকে পরোক্ষ প্রমাণ হিসেবে দেখান যে, দেশটি হয়তো ইরানের বিরুদ্ধে এসব যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে এবং শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে চেয়েছে। এসব হামলার জবাবে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন