যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হবে না ভেনেজুয়েলা। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে দাবি করেছেন তা প্রত্যাখ্যান করে এমন মন্তব্য করেছেন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই তার দেশের।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি বিষয়টি ‘গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন’। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) শুনানির শেষ দিনে রদ্রিগেজ এ কথা বলেন। শুনানিটি ছিল ভেনেজুয়েলা ও প্রতিবেশী গায়ানার মধ্যে খনিজ ও তেলসমৃদ্ধ বিশাল এসকুইবো অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ সংক্রান্ত।
রদ্রিগেজ বলেন, আমরা আমাদের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ইতিহাস রক্ষা অব্যাহত রাখব। এ বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলা কোনো উপনিবেশ নয়, বরং একটি স্বাধীন দেশ।
সোমবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। ফক্স নিউজের সহ-উপস্থাপক জন রবার্টস সামাজিক মাধ্যমে এ তথ্য জানান। তবে ট্রাম্পের মন্তব্যের সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট এখনো পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস। এর আগেও কানাডাকে নিয়ে একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য বানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কানাডা।
পরে ফক্স নিউজে জন রবার্টসকে দেয়া আরেক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট বর্তমান অবস্থাকে কখনো মেনে নেয়ার জন্য পরিচিত নন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করার জন্য রদ্রিগেজের প্রশংসা করেন। রদ্রিগেজ পরে বলেন, ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখছেন। সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য কাজ করছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাব দেয়ার আগে রদ্রিগেজ জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে এসকুইবো অঞ্চলের ওপর ভেনেজুয়েলার দাবি তুলে ধরেন।
তিনি বিচারকদের বলেন, শতবর্ষী এ বিরোধের সমাধান হবে রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে, আদালতের রায়ের মাধ্যমে নয়। ৬২ হাজার বর্গমাইলের এ অঞ্চলটি গায়ানার মোট ভূখণ্ডের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এটি স্বর্ণ, হীরা, কাঠসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এছাড়া উপকূলের কাছে বিশাল অফশোর তেলক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৯ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হচ্ছে। এ উৎপাদন ভেনেজুয়েলার দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের কাছাকাছি। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি গায়ানা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই ভেনেজুয়েলা এসকুইবো অঞ্চলকে নিজেদের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তখন জঙ্গলঘেরা এ অঞ্চলটি তাদের সীমান্তের মধ্যে ছিল।
তবে ১৮৯৯ সালে বৃটেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সালিশকারীরা এসকুইবো নদী বরাবর সীমান্ত নির্ধারণ করেন, যা মূলত গায়ানার পক্ষে যায়। ভেনেজুয়েলার দাবি, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৬৬ সালে জেনেভায় স্বাক্ষরিত চুক্তি কার্যত উনিশ শতকের সেই সালিশি সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দেয়।
তবে ২০১৮ সালে, এসকুইবো উপকূলে এক্সনমোবিল বড় তেল আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়ার তিন বছর পর, গায়ানা সরকার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দ্বারস্থ হয় এবং ১৮৯৯ সালের রায় বহাল রাখার আহ্বান জানায়। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় ২০২৩ সালে। তখন রদ্রিগেজের পূর্বসূরি মাদুরো একটি গণভোট আয়োজন করেন, যেখানে ভোটারদের জিজ্ঞাসা করা হয় এসকুইবোকে ভেনেজুয়েলার একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা উচিত কি না। পরে তিনি অঞ্চলটি শক্তি প্রয়োগে দখলের হুমকিও দেন।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে মাদুরোকে আটক করা হয়। মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে নিউইয়র্কে নেয়া হয়। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
