‘পাকিস্তানে যুদ্ধবিমান লুকিয়ে রাখে ইরান’, সিবিএসের খবর প্রত্যাখ্যান ইসলামাবাদের

‘পাকিস্তানে যুদ্ধবিমান লুকিয়ে রাখে ইরান’, সিবিএসের খবর প্রত্যাখ্যান ইসলামাবাদের

ফন্ট সাইজ:

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি পাকিস্তান গোপনে ইরানি সামরিক বিমান নিজেদের বিমানঘাঁটিতে রাখার অনুমতি দিয়েছিল। এমন দাবি করেছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে বিমানগুলোকে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা দেয়া হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস নিউজ এ খবর দিলেও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ রিপোর্টকে বিভ্রান্তিকর ও অতিরঞ্জিত বলে আখ্যায়িত করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, নূর খান বিমানঘাঁটিতে ইরানি বিমান উপস্থিতির বিষয়ে সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনকে পাকিস্তান স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। এটি বিভ্রান্তিকর ও অতিরঞ্জিত। এ ধরনের অনুমাননির্ভর বর্ণনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার চলমান প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়।

সিবিএস নিউজে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান প্রতিবেশী আফগানিস্তানেও বেসামরিক বিমান পাঠিয়েছিল। তবে ওই ফ্লাইটগুলোর মধ্যে সামরিক বিমান ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার মধ্যেই ইরান তাদের অবশিষ্ট সামরিক ও বিমান চলাচল সংক্রান্ত সম্পদ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছিল। একই সময়ে পাকিস্তান প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিল।

জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলার জন্য পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এপ্রিলের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরান একাধিক বিমান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর নূর খান ঘাঁটিতে পাঠায়। রাওয়ালপিন্ডি সেনানিবাস শহরের কাছে অবস্থিত এই ঘাঁটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ইরান বিমানবাহিনীর একটি আরসি-১৩০ বিমান। এটি লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস কৌশলগত পরিবহন বিমানের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির জন্য ব্যবহৃত সংস্করণ। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিবিএস নিউজকে আফগান ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। এক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা নূর খান ঘাঁটি সংক্রান্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সিবিএস নিউজকে বলেন, নূর খান ঘাঁটি শহরের একেবারে কেন্দ্রে। সেখানে বিপুল সংখ্যক বিমান রাখা হলে তা জনসাধারণের চোখ এড়িয়ে রাখা সম্ভব নয়। সিবিএস নিউজকে এক আফগান বেসামরিক বিমান চলাচল কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ শুরুর কিছু আগে মাহান এয়ারের একটি ইরানি বেসামরিক বিমান কাবুলে অবতরণ করেছিল। পরে ইরানের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেলে বিমানটি কাবুল বিমানবন্দরেই অবস্থান করছিল। এরপর মার্চে পাকিস্তান যখন তালেবান নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে কাবুলে বিমান হামলা শুরু করে, তখন তালেবান কর্তৃপক্ষ বিমানটিকে নিরাপত্তার জন্য ইরান সীমান্তসংলগ্ন হেরাত বিমানবন্দরে সরিয়ে নেয়। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি জঙ্গিবিমানের সম্ভাব্য হামলা থেকে কাবুল বিমানবন্দরকে রক্ষা করা।

ওই কর্মকর্তা বলেন, আফগানিস্তানে এটিই ছিল একমাত্র অবশিষ্ট ইরানি বিমান। তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ আফগানিস্তানে ইরানি বিমানের উপস্থিতির অভিযোগ অস্বীকার করে সিবিএস নিউজকে বলেন- না, এটা সত্য নয় এবং ইরানের এমন কিছু করার প্রয়োজনও নেই।

সিবিএসের খবরের বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানে যুদ্ধবিরতির পর এবং ইসলামাবাদ আলোচনার প্রাথমিক ধাপ চলাকালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকটি বিমান পাকিস্তানে আসে। এসব বিমান কূটনৈতিক কর্মকর্তা, নিরাপত্তা দল এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মীদের যাতায়াতে সহায়তা করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রাথমিক আলোচনা শেষ হওয়ার পর ভবিষ্যৎ বৈঠকের সম্ভাবনা মাথায় রেখে কিছু বিমান ও সহায়ক কর্মী সাময়িকভাবে পাকিস্তানে থেকে যান। যদিও আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনও পুনরায় শুরু হয়নি, তবুও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির ইসলামাবাদ সফর বিদ্যমান লজিস্টিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।

পররাষ্ট্র দপ্তর জোর দিয়ে বলেছে, বর্তমানে পাকিস্তানে থাকা ইরানি বিমানগুলো যুদ্ধবিরতির সময় এসেছে এবং এগুলোর সঙ্গে কোনো সামরিক প্রস্তুতি বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর, বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তব পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। পাকিস্তান সবসময় সংলাপ ও উত্তেজনা হ্রাসের পক্ষে নিরপেক্ষ, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়। পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, এই ভূমিকার অংশ হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী পাকিস্তান নিয়মিত লজিস্টিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে এসেছে এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সংলাপ এগিয়ে নেয়া ও উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আন্তরিক সব প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিতে পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গত এক দশকে সামরিক সহায়তার জন্য পাকিস্তানের চীনের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধান অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশই সরবরাহ করেছে চীন। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কও রয়েছে। ইসলামাবাদ এই সংকটে দুই পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। একদিকে তারা ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠাকারী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তেহরান বা চীনকে অসন্তুষ্ট করতে পারে এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলেছে। চীনকে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থক হিসেবে দেখা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো চীন প্রকাশ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ সহজ করতে পাকিস্তানের ভূমিকাকে প্রশংসা করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধের জন্য তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন