প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান

বৃটেনে মন্ত্রিপরিষদে বিদ্রোহ

প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান

ফন্ট সাইজ:

বিভক্ত হয়ে পড়েছে বৃটেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়। প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের মন্ত্রিপরিষদে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। একে এক ধরনের বিদ্রোহ বলা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য কিয়ের স্টারমার কবে পদত্যাগ করছেন তার একটি সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এমন আহ্বান জানানো মন্ত্রীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। হঠাৎ করে দলে এমন বিদ্রোহ সামাল দিতে ছয়জন মন্ত্রীর সহকারী, যারা সরকারের সবচেয়ে নিচের স্তরের পদে থাকেন, তাদেরকে বদলে নতুনদের নিয়োগ দিয়েছে ডাউনিং স্ট্রিট। তারা কেউ পদত্যাগ করেছেন। আবার কেউ কিয়ের স্টারমারের উত্তরসূরি নির্ধারণের সময়সূচি ঘোষণার দাবি তুলেছিলেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত ৭২ জন লেবার এমপি কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগ অথবা পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভার বৈঠক হওয়ার কথা। সোমবার যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি (পিপিএস) জো মরিস। স্ট্রিটিংকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পদত্যাগ করা মরিস বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছেন।

উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির পিপিএস মেলানি ওয়ার্ড, ক্যাবিনেট অফিসমন্ত্রী ড্যারেন জোন্সের পিপিএস নওশাবাহ খান এবং পরিবেশমন্ত্রী এমা রেনল্ডসের পিপিএস টম রাটল্যান্ডও পদত্যাগ করেছেন। আরও দুজন কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার দাবিতে যোগ দিয়েছেন। তারা হলেন পেনশন বিষয়ক মন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেনের পিপিএস গর্ডন ম্যাকি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের পিপিএস স্যালি জেমসন।

এর আগে এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, তিনি সন্দেহবাদীদের ভুল প্রমাণ করবেন এবং পদত্যাগ করবেন না। তিনি স্বীকার করেন যে সরকার ভুল করেছে। তবে দাবি করেন, বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো তিনি সঠিকভাবেই নিয়েছেন। কিন্তু দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পদত্যাগের চাপ আরও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের সমর্থকদের পক্ষ থেকে তার পদত্যাগের সময়সূচি চাওয়া হয়।
দলের ডানপন্থি অংশ থেকেও দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ঘনিষ্ঠরাও এমন মত দিয়েছেন। এতে বার্নহামের নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।

ইংল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার প্রায় ১৫০০ কাউন্সিলর পদ হারানোর পর থেকেই কিয়ের স্টারমারের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে গ্রিন পার্টির অগ্রযাত্রাও লেবারের সমর্থনে ধস নামিয়েছে।

ওয়েলসেও শত বছরের রাজনৈতিক আধিপত্য হারিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে লেবার। আর স্কটিশ পার্লামেন্টের ১২৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৭টি পেয়ে দলটি ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। এই তিনটি স্থানীয় নির্বাচনে লেবার দলের ভরাডুবির ফলে কিয়ের স্টারমারের ওপর এই চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক বিবৃতিতে জো মরিস বলেন, লেবারের কাউন্সিলর ও প্রার্থীরা এমন সব সিদ্ধান্তের দায় কাঁধে নিয়েছেন, যেগুলো তাদের ছিল না।

হেক্সহামের এমপি মরিস বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও ভোটাররা বিশ্বাস করেন না যে তিনিই সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারবেন, যার জন্য তারা ভোট দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, দেশ ও দলের স্বার্থেই প্রধানমন্ত্রীর উচিত দ্রুত একটি সময়সূচি ঘোষণা করা, যাতে নতুন নেতা জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেন এবং সরকার তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে।

ইস্ট ওর্থিং অ্যান্ড শোরহামের এমপি টম রাটল্যান্ড বলেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির ভেতরেই নয়, সারা দেশেই কর্তৃত্ব হারিয়েছেন এবং তিনি আর তা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন না। গিলিংহ্যাম অ্যান্ড রেইনহামের এমপি নওশাবাহ খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা হারিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি রাজনীতিতে এসেছি ব্যর্থতা দেখেও চুপ করে থাকার জন্য নয়। এখনই আমাদের স্পষ্ট দিক পরিবর্তন দরকার, কোনো রাজনৈতিক খেলা নয়। তিনি আরও বলেন, আমি নতুন নেতৃত্বের আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে আমরা আবার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারি এবং বৃটিশ জনগণ যে ভালো ভবিষ্যতের জন্য ভোট দিয়েছিল, তা নিশ্চিত করতে পারি।

পিপিএস পদটি বেতনহীন এবং একজন মন্ত্রী নিজের সহকারী হিসেবে কাউকে এ পদে নিয়োগ দেন। শাবানা মাহমুদের পিপিএস স্যালি জেমসন বলেন, কিয়ের স্টারমারের উচিত সেপ্টেম্বরে অথবা তার কিছু পরেই পদত্যাগের একটি পরিষ্কার সময়সূচি ঘোষণা করা। ডনকাস্টার সেন্ট্রালের এমপি জেমসন আরও বলেন, লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির (এনইসি) উচিত সব সম্ভাব্য প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সময়সূচিও সে অনুযায়ী নির্ধারণ করা। চলতি বছরের শুরুতে এনইসি অ্যান্ডি বার্নহামকে গর্টন অ্যান্ড ডেন্টনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে বাধা দিয়েছিল। বার্নহাম বহু লেবার এমপির সমর্থন পেলেও নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে হলে তাকে এমপি হতে হবে। সে জন্য আরেকজন এমপিকে পদত্যাগ করে উপনির্বাচনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শুক্রবারের নির্বাচনী ফলাফলের পর নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বকে নতুনভাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা হিসেবে কিয়ের স্টারমার এক ভাষণে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ঘোষণা দেন যে, বৃটিশ স্টিলকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া হবে। এ বিষয়ে এ সপ্তাহেই আইন আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাবেন না। কারণ তা দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেবে, যেমনটা টোরিরা বারবার করেছে।

ডাউনিং স্ট্রিট সাময়িক স্বস্তি পায় যখন লেবার এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। সপ্তাহান্তে উত্তর লন্ডনের এই এমপি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনার পর তিনি নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান জানান। ক্যাথরিন ওয়েস্ট নিজে লেবার নেতা হওয়ার চেষ্টা না করলেও অন্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে উৎসাহিত করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, ততই আরও বেশি লেবার এমপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন, যা তার কর্তৃত্বে নতুন আঘাত হেনেছে। সম্ভাব্য আরেক নেতৃত্বপ্রত্যাশী এবং সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যানজেলা রেইনার কমিউনিকেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের এক সম্মেলনে বলেন, দল হিসেবে আমাদের এর চেয়ে ভালো করতে হবে। তিনি বলেন, কিয়ের স্টারমার গত সপ্তাহের নির্বাচনী ফলাফলের মাধ্যমে ভোটারদের হতাশা স্বীকার করেছেন। তবে শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই আমাদের মূল্যায়ন করা হবে। রেইনার আবারও অ্যান্ডি বার্নহামকে পার্লামেন্টে ফিরে আসার সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। ২০১৭ সালে তিনি এমপি পদ ছাড়েন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন