সুন্দরবনে মধু আহরণ মধুর না

সুন্দরবনে মধু আহরণ মধুর না

ফন্ট সাইজ:

সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় আর বিপদসংকুল এক অরণ্য। এখানে মধু সংগ্রহ বা আহরণ করার কাজটা মধুর মতো মিষ্টি না। সুন্দরবনে বনজীবীদের মধ্যে আছে- জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়াল। পৃথিবীতে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার মধ্যে একটা হচ্ছে মৌয়ালদের পেশা, অর্থাৎ যারা মধু সংগ্রহ করে। মধু সংগ্রহ করতে সুন্দরবনে প্রবেশে মৌয়ালদের সবচেয়ে বড় শঙ্কার নাম মামা (রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে স্থানীয় ভাষায় মামা বলে)। এ ছাড়াও আছেÑ বড় বড় কুমির, সাপ, বিষাক্ত পোকামাকড় এবং একাধিক বনদস্যু বাহিনী। এসব বিপদকে উপেক্ষা করে পূর্বপুরুষের পেশাকে টিকিয়ে রেখেছে সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকার লাখো মানুষ। প্রতি বছর ১লা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত চলে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ। দেশে মধু এবং মোম উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র সুন্দরবন। ১৮৬০ সাল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করা হয়। বনসংলগ্ন মৌয়াল জনগোষ্ঠী বংশপরম্পরায় মধু সংগ্রহ করে থাকেন। দেশে উৎপাদিত মোট মধুর সিংহভাগ সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা হয়।

সুন্দরবনের সবচেয়ে ভালো মানের মধু হচ্ছে খলিশা ফুলের মধু (পদ্ম মধু)। মানের দিক থেকে এরপরেই গরান ও গর্জন ফুলের মধু। মৌসুমের একেবারে শেষে সংগ্রহ করা কেওড়া ও গেওয়া ফুলের মধু অপেক্ষাকৃত কম সুস্বাদু। কয়েক লাখ মানুষের জীবিকার একমাত্র উৎস এই সুন্দরবন। এর একটা হচ্ছে মধু সংগ্রহ। যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের বলা হয় ‘মৌয়াল’। মৌয়ালদের জীবনধারা বিচিত্রময়। মধু সংগ্রহের মৌসুমে এরা নানা রকম নিয়ম মেনে চলে। এ সময় যেহেতু বাড়ির পুরুষরা মধু সংগ্রহে কাজে বনে অবস্থান করে, তাই বাড়ির নারীদের নানা নিয়ম পালন করতে হয়। তারা এ সময় বাড়ি থেকে খুব একটা এলাকার বাইরে যান না। এদের অনেকেই বাড়িতে দুপুরবেলা চুলায় আগুন জ্বালায় না। কারণ তারা বিশ্বাস করে বাড়িতে এ সময় আগুন জ্বালালে বনে মধুর চাকের ক্ষতি হবে। মধু কাটার মাসগুলোতে মৌয়ালরা কারও সঙ্গে তেমন ঝগড়া বিবাদও করে না। মধু সংগ্রহের কাজটা কেবল যে মধু সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়, এর আগে ও পরে বেশ কিছু ঝামেলা পোহাতে হয় মৌয়ালদের।

একদিকে বন বিভাগের অনুমতি (যেটা একেবারে সহজ কাজ না), নৌকা মেরামত, মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেয়া অন্যদিকে বনদস্যুদের খপ্পর। তবে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো বাঘ। একসময় প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ জন মৌয়াল বনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারাতো। এখন এ সংখ্যা কমেছে অনেক, কারণ বাঘের সংখ্যাও কমে গেছে। মৌয়ালরা বনে পা রাখেন বনবিবিকে স্মরণ করে। এরপরেও বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারানোকে মৌয়ালরা নিয়তি হিসেবেই মেনে নেয়।
অনেকেই লঞ্চে ভ্রমণ করতে গিয়ে যে সুন্দরবন দেখেন, মধু সেখানটায় পাওয়া যায় না। গহিন সুন্দরবনের ভেতর যেখানে মধু আছে, সেখানটা ভয়ঙ্কর সুন্দর। কারণ সেসব জায়গা খুবই বিপজ্জনক। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের জন্য প্রতি বছর ১লা এপ্রিল বনবিভাগ মৌয়ালদের অনুমতিপত্র দেয়। সময় নষ্ট না করে শুরুর দিন থেকেই মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা। মধু সংগ্রহের জন্য ২ থেকে ৩টি নৌকায় ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল থাকে। সবাই দলনেতার নেতৃত্বে আগের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী মৌমাছির গতিপথ দেখে বনের কিনারে নৌকা আর মাঝিকে রেখে বাকিরা ভাগ হয়ে বনের ভেতর মধুর চাকের সন্ধান করে (একে স্থানীয় ভাষায় বলে ছাটা দেয়া)। চাক খোঁজার সময় মৌয়ালদের দৃষ্টি উপরের দিকে থাকে বলে মৌয়ালরাই বাঘের আক্রমণের শিকার হয় সবচেয়ে বেশি। মৌচাক পাওয়া মাত্র আল্লাহ্ আল্লাহ্ বলে চিৎকার করে বাকি সঙ্গীদের জানিয়ে দেয়। তা ছাড়া, বাঘকে দূরে রাখারও একটা কৌশল হলো এই চিৎকার। মৌমাছির বড় একটি চাকে অন্তত ১৮ থেকে ২০ কেজি মধু জমা হয়। এমন একটি চাক ঘিরে থাকে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মৌমাছি। মধু সংগ্রহ সবার কাজ নয়, অল্প কয়েকজনের পক্ষেই কাজটা সম্ভব। বনবিভাগই ঠিক করে দেয় কোন দল সুন্দরবনের কোন অংশে মধু সংগ্রহে যাবে। গহিন অরণ্যে মধু সংগ্রহে নৌকা থেকে নামতেই পা চলে যায় এক হাত কাদার ভেতরে, ঘন এবং শক্ত শ্বাসমূলে ভরা কাদামাখা পথ ধরে এগিয়ে যায় মৌয়ালরা কিন্তু তাদের চোখ থাকে গাছে গাছে, হয়তো কোথাও বুক সমান পানিতে পড়ে যায়। এদের গন্তব্যের ঠিক নাই। এত কষ্টের পরে বন থেকে কাক্সিক্ষত মধু সংগ্রহ করে লোকালয়ে ফিরে মহাজনের টাকা শোধ করে পরিবারের সদস্যদের মুখে দু’মুঠো ভাত উঠিয়ে দিতে পারলে এসব জীবনবাজি রাখা মৌয়ালদের শান্তি।

শ্যামনগরের সুন্দরবন সংলগ্ন ছোট ভেটখালী গ্রামের মৌয়াল আকফর গাজী মানবজমিনকে জানান, মধু সংগ্রহের জন্য বনবিভাগ বিএলসি (বৈধ পাস) দেয়ার আগেই অসৎ কিছু মানুষ মাছের পাস নিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে চুরি করে অপরিপক্ব মধুর চাক কাটে। যার ফলে আমরা গিয়ে এখন আর আগের মতো বিশ্ববিখ্যাত খলিশা ফুলের মধু খুব বেশি সংগ্রহ করতে পারি না।



ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন