চলতি সপ্তাহে চীন সফরে আসার কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। এই সফরকে কেন্দ্র করে তাইওয়ান নিয়ে তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বীপরাষ্ট্রটির বিরোধীদলীয় নেতা চেং লি উন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব। তিনি কিছুদিন পূর্বে চীন সফর করেন। ওয়াশিংটন চীনা আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ দিচ্ছে। কিন্তু দ্বীপটির অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা চেং সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার মতে, সংঘাত নয় বরং সংলাপই তাইওয়ানের নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিংয়ে বৈঠক শেষে এবং ডনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কয়েকদিন আগে তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং (কেএমটি)-এর চেয়ারপারসন চেং সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, শুধু অস্ত্র দিয়ে তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, তাইওয়ান কখনোই পরবর্তী ইউক্রেন হতে চায় না। চেং এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন, যখন বিরোধী দল নিয়ন্ত্রিত তাইওয়ানের পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের প্রস্তাবিত প্রায় ৪০০০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর বাজেটটি প্রায় তিনভাগের একভাগ কমিয়ে পাস করা হয়। অনুমোদিত বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কেনার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখা হলেও, তাইওয়ানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রকল্প বিশেষ করে ড্রোন শিল্পের বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসন এশিয়ার মিত্র দেশগুলোকে চীনকে প্রতিরোধে আরও দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা ও সামরিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলছিলেন, কেএমটি কি ইচ্ছাকৃতভাবে তাইওয়ানের সামরিক আধুনিকায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে কিনা। সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে চেং দাবি করেন, কেএমটি তাইওয়ানের জাতীয় প্রতিরক্ষার দৃঢ় সমর্থক।
তিনি আরও বলেন, ৪০০০ কোটি ডলারের বাজেটে অনেক অংশই অস্পষ্ট। পুরো প্যাকেজ অন্ধভাবে অনুমোদন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাট পটিঞ্জার স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক মন্তব্যে তাইওয়ানের বিরোধী দলকে ড্রোন খাতে অর্থ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীরভাবে ভাবার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ড্রোন এমন একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর প্রযুক্তি, যা বড় বড় শক্তির পক্ষেও মোকাবিলা করা কঠিন। এই বিতর্কের মধ্যেই বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে তাইওয়ান ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চেং বলেন, তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেকোনো এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার অর্থ এই নয় যে চীনের প্রতি বৈরিতা থাকতে হবে। কয়েক সপ্তাহ আগে চেং বেইজিং সফরে যান এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন।
গত এক দশকের মধ্যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। একসময় কেএমটির বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ও তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়া চেং এখন দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ওয়ান চায়না নীতিকেও সমর্থন করছেন যা বেইজিং বরাবরই দুই পক্ষের রাজনৈতিক সংলাপের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। চেং বলেন, দুই প্রান্তের মধ্যে এত পার্থক্য থাকার পরও সংলাপের পথ খুঁজে বের করা জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, যুদ্ধ এড়ানোর এটিই একমাত্র পথ। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, চেং বেইজিংয়ের বক্তব্যই পুনরাবৃত্তি করছেন। তাইওয়ানের গণতন্ত্রের জন্য এটি বিপজ্জনক। বিশেষ করে বহিরাগত হস্তক্ষেপ নিয়ে তার মন্তব্যকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের প্রতি পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখছেন, যারা তাইওয়ানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। তাইওয়ানের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, বেইজিং চেংয়ের এই কূটনৈতিক যোগাযোগকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাইওয়ানকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কম ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। এদিকে, চেংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও চীনা যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর জাহাজ তাইওয়ানের আশপাশে টহল অব্যাহত রাখে।
চেং বলেন, যদি তাইওয়ান স্বাধীনতার পথে এগোয়, তাহলে চীন যে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে তা তারা স্পষ্ট করেই বলেছে। তবুও তিনি মনে করেন, সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব। তার দাবি, কেএমটি আবার ক্ষমতায় এলে সামরিক উত্তেজনা ও মুখোমুখি অবস্থান কমে যাবে এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হবে। চেংয়ের দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান তাইওয়ানের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। খোলামেলা বক্তব্য, স্পষ্ট ও স্বল্পভাষী হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারেন এমন জল্পনাও চলছে। তবে এ বিষয়ে সরাসরি কিছু না বলে তিনি বলেন, এখন আমার প্রধান লক্ষ্য হলো স্থানীয় নির্বাচনে কেএমটির জয় নিশ্চিত করা এবং ২০২৮ সালে দলকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নেয়া। তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে তিন বছর তাইওয়ানের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে।
