উপসাগরে নতুন করে নৌ সংঘর্ষের পর শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান। একই সঙ্গে নিজেদের সর্বশেষ আলোচনার অবস্থানের জবাবের জন্য ওয়াশিংটনকে অপেক্ষায় রেখেছে তেহরান। হরমুজ প্রণালির আশপাশে কয়েক দিনের বিক্ষিপ্ত উত্তেজনার পর আপাত শান্ত অবস্থা বিরাজ করছিল। এদিকে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত বন্ধ এবং শান্তি আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাবের অপেক্ষায় ছিল ওয়াশিংটন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন। এতে আরও বলা হয়- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং শান্তি আলোচনা শুরু করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব ইরান ‘সম্ভবত শুক্রবার রাতেই’ দেবে বলে তিনি আশা করছেন। তবে ইরান যদি পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে কোনো জবাব পাঠিয়েও থাকে, তার কোনো প্রকাশ্য ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মার্কিন নেতৃত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
আইএসএনএ সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অসংখ্য কর্মকাণ্ড কূটনীতির পথে মার্কিন পক্ষের উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শুক্রবারের এক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান দুটি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাংকারে গুলি চালিয়ে সেগুলো অচল করে দেয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, জাহাজ দুটি ইরানি বন্দর অবরোধ চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছিল। এক ইরানি সামরিক কর্মকর্তা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, দেশটির নৌবাহিনী মার্কিন সন্ত্রাসবাদের জবাব হামলার মাধ্যমে দিয়েছে এবং এখন সংঘর্ষ থেমে গেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে আরেক দফা উত্তেজনা দেখা দেয়। গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বিদেশি জাহাজ থেকে শুল্ক আদায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায় ইরান।
এদিকে সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দর অবরোধের ফলে তেহরান আরও অন্তত চার মাস গুরুতর অর্থনৈতিক চাপে পড়বে না। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাত বন্ধের প্রচেষ্টায় ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা এখনও সীমিত। ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম এ তথ্য প্রকাশ করে। তবে এক জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই সিআইএ বিশ্লেষণ সম্পর্কিত দাবিগুলোকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, অবরোধ বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান ক্ষতি করছে। বাণিজ্য বিচ্ছিন্ন করছে, রাজস্ব ধ্বংস করছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পতন ত্বরান্বিত করছে।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার জানিয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে একটি সংগঠন ভেঙে দিয়েছে এবং এর সন্দেহভাজন ৪১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি হামলায় দেশটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, বিদেশি পক্ষের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি এবং ইরানি আগ্রাসনের প্রতি সহানুভূতির অভিযোগে প্রসিকিউটর অফিস যে তদন্ত চালিয়ে আসছিল, তার ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা বাহিনী বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠন ভেঙে দিয়েছে।
বৃটেন শনিবার জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় সম্ভাব্য বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নিতে তারা যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রাগন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করছে। বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষম এই ডেস্ট্রয়ারটি মার্চে ইরান যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হয়েছিল, সাইপ্রাস রক্ষায় সহায়তার জন্য। বৃটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, এইচএমএস ড্রাগনকে আগে থেকেই অবস্থান করানো সতর্কতামূলক পরিকল্পনার অংশ, যাতে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বৃটেন ও ফ্রান্সের যৌথ নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক জোটের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করতে বৃটেন প্রস্তুত থাকে।
লেবাননে হামলা
ওদিকে লেবাননে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় আটজন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বৈরুতের দক্ষিণে একটি মহাসড়কেও নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে, যা হিজবুল্লাহর ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটির বাইরে এবং চলমান সংঘর্ষের কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে তিন সপ্তাহ আগে হওয়া যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও নতুন করে এই হামলা চালানো হলো। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে একাধিক ইসরাইলি হামলার খবর দিয়েছে, যার মধ্যে সাকসাকিয়েহ শহরেও হামলা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই হামলায় এক কন্যাশিশুসহ প্রাথমিকভাবে সাতজন শহীদ এবং তিন শিশুসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ শহরে একটি মোটরসাইকেলে চালানো আরেক হামলায় এক সিরীয় নাগরিক এবং তার ১২ বছর বয়সী কন্যা আক্রান্ত হন। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা প্রথম হামলার স্থান থেকে সরে যেতে সক্ষম হওয়ার পর ড্রোনটি দ্বিতীয়বার হামলা চালায়। এতে তার পিতা নিহত হন। পরে ড্রোনটি মেয়েটিকেও সরাসরি তৃতীয়বার লক্ষ্যবস্তু করে। মেয়েটির জীবন রক্ষায় অস্ত্রোপচার চলছে বলে জানানো হয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় তারা হিজবুল্লাহর ৮৫টির বেশি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
