ইঁদুরবাহিত ভাইরাসে দুঃস্বপ্নের প্রমোদযাত্রা

ইঁদুরবাহিত ভাইরাসে দুঃস্বপ্নের প্রমোদযাত্রা

ফন্ট সাইজ:

দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ৩৯ দিন আগে যখন এমভি হন্ডিয়াস যাত্রা শুরু করে, তখন যাত্রী ও ক্রুদের মধ্যে ছিল উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের আবহ। ছিল এক ধরনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের অনুভূতিও। একসঙ্গে খাওয়া, পান করা, রোমাঞ্চকর অভিযানে যাওয়া এবং পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলো ঘুরে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের এক অদ্ভুত বন্ধন। কথায় আছে, জাহাজের সঙ্গীদের মতো বন্ধু আর হয় না। আর কিছু ভ্রমণ থাকে জীবনে একবারই হওয়ার মতো- যেগুলো এত স্মৃতি এক করে যে একাধিক ফটো অ্যালবাম ভরে যায়।

অ্যাটলান্টিক ওডিসি ছিল তেমনই একটি যাত্রা।
সাত ডেকে সাজানো কেবিনগুলোর একটিতে থাকার জন্য যাত্রীরা ২৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করেন। কিন্তু যাত্রার শুরুতে কেউ কল্পনাও করতে পারেননি যে বরফখণ্ড দেখা, পেঙ্গুইন, তিমি, অ্যালবাট্রস ও বিরল বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সেই বন্ধন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। একজন যাত্রীর মৃত্যু জাহাজটিকে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে!

হান্টাভাইরাস একটি বিরল কিন্তু প্রাণঘাতী ভাইরাস, যা ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়। এ পর্যন্ত এই ভাইরাসে ওই প্রমোদতরীর তিনজন মারা গেছেন। আরও পাঁচজন, সম্ভবত ছয়জন, যাদের মধ্যে তিনজন বৃটিশ এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ভাইরাসের একটি বিশেষ ধরন মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে এবং এর মৃত্যুহার ৪০ শতাংশ।

জাহাজটি যখন কেপ ভার্দে’তে ঢুকতে না পেরে টেনেরিফের দিকে যাচ্ছে, তখন বিশ্বজুড়ে তীব্র তল্লাশি চলছে পথে যেসব যাত্রী নেমেছেন, তাদের সংস্পর্শে কারা এসেছেন তা খুঁজে বের করতে। রুহি জেনেত দুই সন্তানের জনক ও একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা তাদেরই একজন। দুই সপ্তাহ আগেও তিনি এমভি হন্ডিয়াসের যাত্রী ছিলেন। এখন ইস্তাম্বুলে নিজের বাড়িতে উদ্বিগ্নভাবে স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন। ডেইলি মেইলকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেন ১২ এপ্রিলের সেই মুহূর্ত, যখন জাহাজের ক্যাপ্টেন ঘোষণা দেন যে ৭০ বছর বয়সী এক ডাচ যাত্রী মারা গেছেন। রুহি আরও স্মরণ করেন, কীভাবে সবাই ওই ব্যক্তির বিধবা স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে গিয়েছিল। তিনি জানতেন না যে তার স্বামী এক মারাত্মক ভাইরাসে মারা গেছেন এবং তিনিও সেই ভাইরাস বহন করছেন। সবাই তার জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছিল। তাকে জড়িয়ে ধরছিল, কথা বলছিল। মানুষ শুধু তাঁকে সমর্থন দিতে চাইছিল, কারণ তিনি তার স্বামীকে হারিয়েছেন। তিনি খুবই ভালো ও দয়ালু মানুষ ছিলেন। কিন্তু এখন মনে হয়, মানুষ তার এত কাছে যাওয়া ও জড়িয়ে ধরা হয়তো ঠিক হয়নি।

আরও উদ্বেগের সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন, জাহাজের জীবন কীভাবে আগের মতোই চলতে থাকে। তিনি বলেন, অবশ্যই সবাই দুঃখ পেয়েছিল। কিন্তু সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে। আমরা একসঙ্গে খেতাম, পান করতাম, বুফেতে যেতাম। কেউ জানত না যে ভাইরাসটি যাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। দলীয় কার্যক্রম চলতেই থাকে- তারকা দেখা, ব্যায়ামের ক্লাস, পাখির ছবি তোলা, লেকচার, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার বৈঠক- সব কিছু। মানুষ সবসময় একে অপরের খুব কাছে বসত। এখন ফিরে তাকালে, ভাইরাসটি জাহাজে ছিল আর আমরা সবাই এত কাছাকাছি ছিলাম, এটা ভাবতেই ভয় লাগে।

অ্যাটলান্টিক ওডিসির প্রথম ধাপের সমাপ্তি হওয়ার কথা ছিল ২৪ এপ্রিল সেন্ট হেলেনায়। সেখান থেকে ১২টি দেশের ৩০ জন যাত্রীর নেমে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। রুহিও তাদের একজন ছিলেন। মৃত ডাচ ব্যক্তির বিধবাও ছিলেন সেই দলে। রুহি বলেন, জাহাজ থেকে নামার সময় তিনি লক্ষ্য করেন ওই নারী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমি মনে করতে পারি, যেদিন আমরা নামলাম সেদিন তিনি হাঁটতেই কষ্ট পাচ্ছিলেন। দুই দিন পর তিনিও মারা যান। তাকে বিমানযোগে জোহানেসবার্গের হাসপাতালে নেয়া হয়।

জাহাজটি বর্তমানে তার চূড়ান্ত গন্তব্য টেনেরিফের গ্রানাদিলার দিকে এগোচ্ছে, যা মূল গন্তব্য কেপ ভার্দে থেকে ৯০০ নটিক্যাল মাইল দূরে। শনিবার ভোরে সেখানে পৌঁছানোর কথা। হন্ডিয়াসের এক সপ্তাহ আগেই কেপ ভার্দে’তে পৌঁছে যাত্রী নামানোর কথা ছিল। কিন্তু সংক্রমণ সংকট বৈশ্বিক আতঙ্ক তৈরি করে। বিশেষ করে কারণ ১লা এপ্রিল যাত্রা শুরু করা যাত্রীরা এসেছিলেন ২৮টি দেশ থেকে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন