উন্নয়নের নতুন চ্যালেঞ্জ: কেন দরকার শিল্প-কারখানা দক্ষতা মূল্যায়ন কমিশন

ফন্ট সাইজ:

এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয় ও তারেক রহমানের জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠা রাজনৈতিক কূটচাল, কলাকৌশল বা কৌলিন্য-অভিজাত্য প্রদর্শনের ফল নয়; বরং স্বচ্ছ, সরল, সাধারণ ও পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক আচরণ ও অভিব্যক্তির মাধ্যমেই এই জনপ্রিয়তা অর্জিত হয়। মনে করা যায়, তাঁর প্রতি সমর্থন রাজনীতি বা পেশাদারিত্বের সীমা ছাড়িয়ে আবেগের সীমাও স্পর্শ করেছে।

সেই কারণে তিনি নিজেও হয়তো আরও গভীরভাবে অনুভব করেন, তাঁর দায়িত্বের ভার হবে একজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের ভার অপেক্ষা আরও বেশি। জনগণ বা ভোটারের এই ভালোবাসার জবাব তারেক রহমানকে দিতে হবে সীমিত কয়েকটি শব্দের মধ্য দিয়ে; সুশাসন, শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, সাম্যতা ও ক্ষমা। একই সঙ্গে সরকারি দলের শব্দভান্ডার থেকে কিছু শব্দ চিরতরে নিষিদ্ধ থাকা উচিত; প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব।

স্মরণযোগ্য, অপ্রতুল সম্পদ ও অধিক জনসংখ্যার দরিদ্র দেশে নেতা-নেত্রীর ভুল, গাফিলতি কিংবা সুযোগকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর ব্যর্থতাকে আগামী প্রজন্ম অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করতে পারে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা সত্তরের দশকে আট কোটি মানুষের ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছিলেন, বাংলাদেশের জন্য জনসংখ্যা সমস্যা বড় সমস্যা নয়; প্রকৃত সমস্যা দক্ষতা সৃষ্টি এবং উৎপাদিত সম্পদের সুষম বণ্টন। কিন্তু সেই সময়ের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই মন্তব্য বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। অথচ তা বিংশ শতাব্দীর মধ্যেই, মাত্র বিশ বছরের ব্যবধানে সত্য প্রমাণিত হয়। দ্রুত উন্নতির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকায় ছিল মানবসম্পদ, যাকে একসময় প্রধান বাধা হিসেবে দেখা হতো।

স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরে সার্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রা যুক্ত হওয়ায়, আজকের নেতৃত্ব যদি শিল্পসমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস দেখায়, তবে তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত বলেই মনে হবে। মানুষের মেধা ও ঘামের যথোপযুক্ত ব্যবহারের জন্য এটাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

এ কথা ভাবা মোটেও ভুল হবে না, আজকের অবস্থান থেকে কয়েক ধাপ উন্নত কারিগরি পণ্য উৎপাদন এবং কিছুটা জটিল ও অত্যাধুনিক কারখানার প্রসারের জন্য বাংলাদেশ এখন উর্বর ক্ষেত্র। উৎপাদন ও প্রযুক্তি বিস্তারের নানা শাখায় বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অভাবনীয় সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে সম্ভাবনা যত শক্তিশালী, সঠিক রোডম্যাপ তৈরি, প্রকৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ততই কঠিন। তবু চরম সত্য হলো, বাংলাদেশ এখন এই উন্নতির ন্যায্য দাবিদার।

সতর্কতার সঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিশ কোটি মানুষের অর্থনীতি যদি বিদেশি বাজারনির্ভর মাত্র দুটি সেক্টর, গার্মেন্টস ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তা স্থিতিশীলতার নির্ভরযোগ্য লক্ষণ নয়। এটিও সত্য, এই দুটি সেক্টরে দেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে, যা সুফল বণ্টনের ক্ষেত্রে সহায়ক। তবে উচ্চতর পণ্যে একই সমান মনোযোগ ও সমান কষ্ট স্বীকার করতে পারলে অধিক ফল প্রত্যাশার যথেষ্ট যুক্তি আছে। উন্নততর পণ্যের জন্য আরও বহুমুখী কারিগরি সমন্বয় প্রয়োজন। সেই স্তরের পণ্য উৎপাদনের সাহস ও বাস্তবতা অতিক্রমের সক্ষমতা এখন বাংলাদেশের রয়েছে।

শিল্পকারখানার ব্যাপ্তি প্রসারের বড় সম্ভাবনাও স্পষ্ট, বিশেষ করে যখন প্রমাণিত যে আমাদের জিডিপির ৩৫ শতাংশ উপাদান শিল্পকারখানা থেকে আসে এবং এই ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। শিল্পকারখানার সম্প্রসারণ মানবসম্পদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

নতুন পণ্য ও নতুন কারখানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই কারখানা ও পণ্যকে পরিবেশবান্ধব করার কাজ, পূর্বে স্থাপিত পুরোনো কারখানার কাঠামো পরিবর্তন করে পরিবেশবান্ধবে রূপান্তরের তুলনায় সহজ। সে দিক থেকে বাংলাদেশ উন্নত দেশ থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। পরিবেশবান্ধব কারখানা সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতায় দ্রুত অগ্রগতির সম্ভাবনাও বেশি। ঘনবসতির বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। পরিকল্পিতভাবে ভোগ্যপণ্যের শিল্পকারখানা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিলে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো সহজ হতে পারে।

কারিগরি পণ্য উৎপাদন ও শিল্পকারখানা প্রসারে বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন; বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সংকট সামনে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যেসব ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বা জ্বালানির ব্যবহার কম এবং সীমাবদ্ধতার অজুহাতও কম ছিল, সেসব ক্ষেত্রেও অগ্রগতি মোটেও আশানুরূপ হয়নি। এতে অনুমান করা যায়, বিলম্বের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে; অথবা আমরা সেই ধরনের চিন্তা থেকেই দূরে ছিলাম।

দায়িত্ববানদের আলোচনায় সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ সত্ত্বেও উন্নততর ভোগ্যপণ্য ও কারিগরি পণ্য উৎপাদনের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, যদিও জ্ঞান ও দক্ষতা সেখানে মুখ্য। অত্যন্ত উচ্চস্তরের পণ্যের প্রস্তুতির সক্ষমতা অর্জনে সময় ও নানা প্রভাবক প্রয়োজন, সেই যাত্রা অনেক দীর্ঘ। তবে উচ্চমূল্যের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন, কারিগরি পণ্যের আমদানি হ্রাস এবং কিছু যন্ত্রপাতি প্রস্তুতের সক্ষমতা অর্জন থেকে আমরা খুব দূরে নই। এ ধরনের অগ্রগতি বৈদেশিক মুদ্রা আয়, সাশ্রয় ও কর্মসংস্থানে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং পরিবেশসহ বিশ্বের কারিগরি বিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কিছু উচ্চতর পণ্য ও কারিগরি পণ্য উৎপাদনকে এখনই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। সরকার এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে, যা বহুমাত্রিক প্রভাব সৃষ্টি করবে, সহযোগিতা ও উৎসাহ জোগাবে এবং পূর্ববর্তী বাধা দূর করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে। অতীতে শিল্প ও কারখানা প্রসারে সরকারি বিভাগগুলোর ফলাফল খুব দৃশ্যমান ছিল না।

নতুন সরকারের উচিত হবে শিল্প সম্প্রসারণে ‘শিল্প-কারখানা দক্ষতা মূল্যায়ন কমিশন’ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা। কারিগরি উন্নয়ন, বিনিয়োগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক লুটপাট রোধে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। এই কমিশন নীতিমালা ও পদ্ধতি স্পষ্ট করবে, শিল্পব্যয়ের মানদণ্ড নির্ধারণ করবে এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্প উন্নয়নে নিয়ম ও মান নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা-ইনস্টিটিউটের সমন্বয় এবং প্রশাসনকে কারখানামুখী করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বহুধারাকে ঐক্যবদ্ধ করে দক্ষ সমন্বয়ের মাধ্যমে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখা এই কমিশনের পক্ষে সম্ভব। প্রযুক্তিবিদদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা হ্রাসেও এটি সহায়ক হতে পারে। সরকারি প্রণোদনার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং বহুখাতনির্ভর শিল্প চিহ্নিত করাও কমিশনের দায়িত্বের অংশ হতে পারে।

কুঠির শিল্প সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাও বদলানো সম্ভব। উচ্চমানের কারিগরি যন্ত্রাংশ কুঠির শিল্পেও তৈরি হতে পারে। বাসায় বসে সফটওয়্যার বা ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণও এক ধরনের কুঠির শিল্প। ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে শিল্পকারখানার নতুন বিপ্লব ঘটলে অনেক উৎপাদনব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের দিকে যেতে পারে, যা কুঠির পর্যন্ত শাখা বিস্তার করতে পারে। সেই প্রস্তুতি এখন থেকেই নেওয়া প্রয়োজন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের বিস্তারে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ তখনই কমবে, যখন আমরা জ্ঞানসমৃদ্ধ প্রস্তুতি নিতে পারব। ইতিহাস বলে, নতুন প্রযুক্তি কর্মসংস্থান কমায় না; বরং নতুন ধরনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। তবে প্রস্তুতির গতিপথ এখানে মুখ্য এবং দিক ভিন্ন হতে পারে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন ও হিউম্যানয়েড রোবটের বিস্তারে কিছু সংকুচিত হতে পারে। তাই বিকল্প সুযোগের আগাম প্রস্তুতি জরুরি। একই সঙ্গে আধুনিক কারিগরি পণ্য উৎপাদনে আমাদের বর্তমান সক্ষমতা আরও নির্ভরযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব কারখানা কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে সম্ভব নয়; পণ্যের নকশা ও প্রকৌশল পরিকল্পনার শুরু থেকেই তা নিশ্চিত করতে হয়।

শিল্প-সহায়ক পরামর্শ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয় ও বিনিয়োগ লাগে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা বড় সাশ্রয় এনে দিতে পারে। দক্ষতা ও সৃজনশীলতা জরুরি। সরকার গবেষণা ও দক্ষ পরামর্শ প্রতিষ্ঠান গঠনে সহায়তা দিতে পারে। একটি শিল্প-দক্ষতা মূল্যায়ন কমিশন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য গড়ে তুলতে পারে। মনে রাখতে হবে, উচ্চতর পণ্য ও উন্নত কারখানা প্রতিষ্ঠায় পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা যেমন জরুরি, তেমনি সামাজিক সচেতনতা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির সক্রিয় সংযুক্তিও স্থায়ী উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো যন্ত্রাংশ ও শিল্পযন্ত্র প্রস্তুত। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও অন্য বাস্তবতায় কাঁচামাল তৈরিতে সীমাবদ্ধতা থাকলেও বহুবিধ যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি সম্ভব। প্রয়োজনে বিদেশি প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এ খাতে অগ্রগতি ঘটানোর চিন্তা করা যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও কর্মসংস্থান উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। কারিগরি পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারও বিশাল।

অপার সম্ভাবনার এই দেশ যদি উন্নতি করতে ব্যর্থ হয় এবং পরবর্তী প্রজন্ম যদি আবিষ্কার করে যে বড় বাধা ছিল সীমিত মানসিকতা, তবে ইতিহাসের মানবিক আদালতে আমরা দায়ী থাকব।

উৎপাদন ও কারখানায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাহিত্য-সংস্কৃতির সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। প্রযুক্তিবিদদের চিন্তা, স্বপ্ন ও সামাজিক মর্যাদা বিস্তারে এ সংযোগ শক্তি জোগাতে পারে।

লেখক: তড়িৎ প্রকৌশলী ও লেখক
টরেন্টো, কানাডা