দূর পাল্লার নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করেছে তুরস্ক। এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম তারা দিয়েছে ইয়িলদিরিমহান। এটি প্রায় ৬০০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম এবং শব্দের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে বলে জানানো হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি ৩০০০ কেজি বিস্ফোরক বহনে উপযোগী। তুরস্কে অনুষ্ঠিত সাহা আর্ন্তজতিক প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ প্রদর্শনীতে এটি এই প্রথম প্রকাশ করা হলো। তুর্কি শব্দ ইয়িলদিরিম মানে বজ্র এবং ইয়িলদিরিমহান মানে বজ্রের শাসক। নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তুরস্ক এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকা মহাদেশে হামলা চালাতে সক্ষম হবে। যদিও এখন অব্দি তারা এটি পুরোদমে উৎপাদন শুরু করেনি। তবে প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে এ ক্ষেপণাস্ত্রের মডেল উন্মোচনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রদর্শনীতে বক্তব্য দিতে গিয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের বলেন, এমন এক সময়ে যখন অর্থনৈতিক ব্যয় নিজেই একটি অস্ত্র হয়ে উঠেছে তখন তুরস্ক তার জনগণ ও মিত্রদের শুধু অস্ত্রব্যবস্থা নয় প্রযুক্তি ও টেকসই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কয়েকটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক জার্মান মার্শাল ফান্ডের আঞ্চলিক পরিচালক ওজগুর উনলুহিসারজিকলি আল জাজিরাকে বলেন, আমার মতে, বর্তমানে তুরস্কের এমন কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই যার জন্য ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল (আইসিবিএম) প্রয়োজন। তাই ক্ষেপণাস্ত্রটির চেয়ে এটি তৈরির সক্ষমতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইস্তাম্বুলভিত্তিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বুরাক ইলদিরিম বলেন, আইসিবিএমের নকশা তুরস্কের বেসামরিক মহাকাশ কর্মসূচিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ডেল্টা-ভি কর্মসূচিতে, যার লক্ষ্য তুর্কি রকেট ব্যবহার করে নিজস্ব স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো। তিনি বলেন, কক্ষপথে পৌঁছানোর পদার্থবিদ্যা এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইলের গতিপথের পদার্থবিদ্যা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। প্রযুক্তিগতভাবেও এ দুই ক্ষেত্রে বড় ধরনের মিল রয়েছে। সে অর্থে আইসিবিএম সক্ষমতা একটি শক্তিশালী মহাকাশ কর্মসূচির স্বাভাবিক কার্যক্রম। পাশাপাশি তিনি এর রাজনৈতিক গুরুত্বও স্বীকার করেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সাহা ২০২৬ এ যা দেখানো হয়েছে তা এখনো কেবল একটি ধারণা বা মক-আপ। এখনো কোনো নিশ্চিত পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে সোমালিয়ায় যে ঘাঁটির কথা বলা হচ্ছে, সেটিও এখনো নির্মিত হয়নি। তাই এটি বাস্তব সক্ষমতা নয়, বরং উচ্চাকাক্সক্ষা। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আলি বাকির বলেন, এই প্রকল্প আঙ্কারার জন্য একটি বড় অগ্রগতি। এই উন্নয়ন তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক। এর মাধ্যমে দেশটি উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিধারী সীমিত কয়েকটি দেশের কাতারে যোগ দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, এটি শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নয়, বরং তুরস্কের প্রতিরোধ সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলেরও অংশ।
কেন ‘ইয়িলদিরিমহান’ তৈরি করছে তুরস্ক?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তুরস্কের নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের ঘোষণা এলো। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা এবং গাজা ও লেবাননে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মার্চ মাসে আঙ্কারা দাবি করে, ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমার কাছে ভূপাতিত হয়েছে। যদিও তেহরান এ হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ইসরাইলকে দায়ী করে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট তুরস্ককে ইসরাইলের জন্য নতুন হুমকি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের তেহরানের হুমকির পাশাপাশি আঙ্কারার বিরুদ্ধেও কাজ করতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এপ্রিল মাসে ইস্তাম্বুলে এক সম্মেলনে তিনি বলেন, গণহত্যাকারীরা সব ধরনের মানবিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে শিশু, নারী ও নিরীহ মানুষ হত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষক আলি বাকিরের মতে, ইসরাইল নিয়ে উদ্বেগ একমাত্র কারণ নয়। বরং তুরস্ক দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি অস্ত্রনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে চায়।
তিনি বলেন, এটি ক্ষমতাসীন এ কে পার্টি ও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা এবং জাতীয় নিরাপত্তায় কৌশলগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বুরাক ইলদিরিমের মতে, ইসরাইলের দূরপাল্লার সামরিক হামলার সক্ষমতা আঙ্কারার নজর এড়ায়নি। তিনি বলেন, তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ নেই, কিন্তু কৌশলগত স্বার্থে বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে। যখন তুর্কি কর্মকর্তারা দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ব্যবস্থার কথা বলেন, তখন ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়। তার মতে, সিরিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, ইরাক এবং ইরান ঘিরে চলমান অস্থিরতা তুরস্ককে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তুরস্কের সামরিক শক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থায়ী সেনাবাহিনীর অধিকারী। তারা বর্তমানে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি। ১৯৮৫ সালে প্রতিরক্ষা শিল্প উন্নয়ন সংস্থা গঠনের মাধ্যমে দেশটি সামরিক স্বনির্ভরতার পথে যাত্রা শুরু করে। ২০১০ সালের পর থেকে দেশীয় প্রযুক্তিতে অস্ত্র উৎপাদনে জোর দেয় আঙ্কারা। বর্তমানে হাজারো তুর্কি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থল, নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ রপ্তানি ১০০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তুরস্কের সবচেয়ে বেশি রপ্তানিকৃত সামরিক পণ্য হলো বায়রাক্তার টিবি২ ড্রোন। এটি অন্তত ৩১টি দেশে রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন, পাকিস্তান, কাতার, বাংলাদেশ, কেনিয়া ও জাপান। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়িলদিরিমহান প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্ক বিশ্বকে বার্তা দিতে চায় যে, তারা শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়।
সূত্র: আল জাজিরা
