বিজ্ঞজনেরা বহু আগে থেকেই বলে আসছেন— শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত দুই দশকে সেই মেরুদণ্ড শুধু দুর্বলই হয়নি, এক পর্যায়ে বেঁকে গেছে, কোথাও কোথাও ভেঙেও পড়েছে। পরীক্ষানির্ভরতা তুলে দেওয়ার নামে মানহীনতা, যোগ্যতার বদলে সংখ্যা বৃদ্ধি, দলীয়করণ ও দুর্নীতির বিষবাষ্পে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ গভীর সংকটে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাখাতকে পুনরুদ্ধারের প্রশ্নটি আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
চার দলীয় জোট সরকারের সময় শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ড. এহছানুল হক মিলন–এর নামটি আজ আবার নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে তার নেতৃত্বেই শিক্ষাখাতে এসেছিল গুণগত পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ। বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষায় নকল বন্ধে তার কঠোর অবস্থান শিক্ষার্থীদের আবার পাঠ্যবইমুখী করেছিল। ফলাফলনির্ভর নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি তখনই প্রথম দৃশ্যমান হয়।
সে সময় শিক্ষা প্রশাসনে হঠাৎ হঠাৎ পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ছিল নিয়মিত ঘটনা। এসব আকস্মিক পরিদর্শন দুর্নীতিগ্রস্তদের জন্য ছিল আতঙ্কের নাম। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে তখন একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল—পরীক্ষা মানেই ন্যায্যতা, মূল্যায়ন মানেই মেধার স্বীকৃতি।
কিন্তু ২০০৯ সালের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একের পর এক শিক্ষামন্ত্রী পরিবর্তিত হলেও শিক্ষানীতির মূল দর্শনে আসে না গুণগত উন্নয়নের প্রতিফলন। নুরুল ইসলাম নাহিদের সময়ে পাসের হার বাড়ানোর জন্য পরীক্ষায় অংশ নিলেই পাস করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফেল করালে শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও তৈরি হয়। এতে শিক্ষক সমাজ যেমন ভীত হয়ে পড়ে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মাঝেও পড়াশোনার আগ্রহ কমতে শুরু করে।
পরবর্তীতে দীপু মনি ও মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সময় ‘নতুন কারিকুলাম’-এর নামে পরীক্ষাপদ্ধতিই কার্যত বাতিল করা হয়। মূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাবিমুখ হয়ে পড়ে। এর ফল সরাসরি দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়—যোগ্য শিক্ষার্থীর অভাব, মান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা এবং উচ্চশিক্ষায় টিকে থাকার অক্ষমতা।
এর ওপর করোনা মহামারির সময় পরীক্ষা ছাড়াই অটো পাস চালু করা শিক্ষাখাতকে কার্যত আইসিইউতে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে দু’চারটি বিষয়ের পরীক্ষা নিয়ে পাবলিক পরীক্ষার নামে যে ছেলেখেলা হয়েছে, তা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিলেও অভিযোগ উঠেছে—পুরো শিক্ষাখাতকে পরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ আদর্শিক গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বোর্ড, অধিদপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ এখন প্রকাশ্য। এতে শিক্ষার মান আরও তলানিতে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই বাস্তবতায় দীর্ঘ দুই দশক পর নির্বাচনের মাধ্যমে ভূমিধ্বস বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনের আগে শিক্ষাখাত নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শিক্ষাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা, গুণগত পরিবর্তন আনা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সাহসী নেতৃত্ব। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় একটি অংশ মনে করেন—ড. এহছানুল হক মিলনের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে আবারও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে শিক্ষাখাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই দাবি জোরালো হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ড. মিলনের পূর্ববর্তী ভূমিকা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, শিক্ষাখাতে বিদ্যমান জঞ্জাল, দুর্নীতি ও দলীয়করণ দূর করতে তার মতো কঠোর অথচ সৎ নেতৃত্বই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম,খুলনা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক সোশ্যাল মিডিয়ায় একই মত পোষণ করেন। তাদের ভাষায়, “ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলই প্রমাণ করে বিগত দিনে শিক্ষার মান কোথায় নেমেছে। শিক্ষাকে আবার মানসম্মত করতে হলে অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতৃত্ব দরকার।”
“গত ১৭ বছর ধরে শিক্ষাখাতকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এখন বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়া। এজন্য ড. মিলনের মতো মানুষ দরকার।”
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন স্পষ্ট—শিক্ষার মেরুদণ্ড সোজা করতে কি আবার ফিরছেন সেই অভিজ্ঞ নেতৃত্ব? যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সত্যিই ড. এহছানুল হক মিলনের মতো একজন যোগ্য ও সাহসী ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে শুধু শিক্ষাখাতই নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎই নতুন করে আশার আলো দেখতে পারে। আর সেটিই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে শক্ত ভিত।
সবশেষে বলা যায়, শিক্ষা কোনো দলীয় বিষয় নয়, এটি একটি জাতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তাই শিক্ষানীতিতে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য। এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রচিন্তক ও মুক্তিসংগ্রামী নেলসন ম্যান্ডেলা–এর একটি বিখ্যাত উক্তি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—
“Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.”
(শিক্ষা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যার মাধ্যমে তুমি পুরো পৃথিবীকে বদলে দিতে পারো।)
এই দর্শনকে সামনে রেখেই যদি আগামী সরকার শিক্ষাখাতে অভিজ্ঞ, সাহসী ও সৎ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেয়, তবে শুধু শিক্ষাব্যবস্থারই নয়—পুরো জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের পথ সুগম হবে। শিক্ষার মেরুদণ্ড সোজা হলেই সোজা হবে জাতির পথচলা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]
শিক্ষার মেরুদণ্ড সোজা করতে কি ফিরছেন অভিজ্ঞ নেতৃত্ব?
নিয়াজ মাহমুদ
মত-মতান্তর
৬ মাস আগে
১৭ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৯ঃ৩০ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
