অমিত শাহের ৪৫ দিনের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া

অমিত শাহের ৪৫ দিনের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের

ফন্ট সাইজ:

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন হলে ৬০০ একর জমি নিশ্চিত করে ৪৫ দিনের মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সময়সীমা ‘অবাস্তব ও অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী’। বিএসএফের সাবেক মহাপরিচালক প্রকাশ সিং দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, এ ধরনের সময়সীমা নির্ধারণ রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো শোনায়। নিঃসন্দেহে এখন বিজেপি সরকার এলে অসমাপ্ত বেড়া নির্মাণের কাজ দ্রুত এগোনো সহজ হবে। কারণ বিদায়ী তৃণমূল সরকার বিএসএফকে জমি দিচ্ছিল না।

তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের জোরালো উদ্যোগে জমি অধিগ্রহণ দ্রুত হতে পারে এবং নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব। তবে ‘৪৫ দিনের মধ্যে শত শত কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবসম্মত নয়।’

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে নির্বাচনী লড়াইয়ে অনুপ্রবেশ একটি বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রচারণায় শাহ অভিযোগ করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ৬০০ একর জমি বিএসএফকে দেয়নি, যাতে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ বিলম্বিত হয় এবং অনুপ্রবেশ চলতে পারে। বিজেপি দাবি করে, তৃণমূল সরকারের ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়’ রাজ্যে ‘উদ্বেগজনক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ ঘটেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শাহের নেতৃত্বে বিজেপি অভিযোগ তোলে- বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীরা’ পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে ভারতে ঢুকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
সাবেক এক গোয়েন্দা ব্যুরো প্রধান বলেন, ৪৫ দিনের সময়সীমা ‘রাজনৈতিক কৌশল’ মাত্র। তার মতে, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের কারণে এত দ্রুত বেড়া নির্মাণ করা অত্যন্ত কঠিন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা থাকলেও জমি অধিগ্রহণে আইনি, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জটিলতা থাকে, যা সময়সাপেক্ষ। ৪৫ দিনের সময়সীমা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত।

সূত্র জানায়, প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণ হয়েছে। তবে এখনও বড় অংশে বেড়া নেই এবং দ্রুত জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন। গত মাসে কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে তিরস্কার করে জানায়, ১২৭.৩২৭ কিলোমিটার জমির মধ্যে মাত্র ৮ কিলোমিটার বিএসএফকে হস্তান্তর করা হয়েছে, যদিও কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষতিপূরণের অর্থ আগেই দিয়েছিল।

প্রকাশ সিং বলেন, ‘যেখানে বেড়া নেই সেসব এলাকায় বেড়া নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে।’ বিএসএফ সূত্র জানায়, সীমান্তের বেশ কিছু দুর্বল পয়েন্ট বিশেষ করে নদীপথ- এখনও এমন অবস্থায় রয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেন, স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর বেড়া নির্মাণের কাজও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এই প্রযুক্তিতে ক্যামেরা, সেন্সর, লেজার ও রাডার ব্যবহৃত হয়। কন্ট্রোল রুমে বসে বিএসএফ সদস্যরা নজরদারি করতে পারেন এবং কোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা হলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম বেজে ওঠে। প্রকাশ সিং বলেন, পুরো সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। তবে এটিকে নিরাপদ করা সম্ভব, যাতে সহজে ভাঙা না যায়।

বাংলাদেশের আপত্তি
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এই বেড়ার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের যুক্তি, ১৯৭৫ সালের যৌথ নির্দেশিকা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করা যাবে না। ভারত দাবি করে, তাদের এক সারির বেড়া ‘প্রতিরক্ষা কাঠামো’ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়েও বিভক্ত বিএসএফ কর্মকর্তারা। তা হলো সীমান্তের নদীপথে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কুমির ও সাপ ছাড়ার পরিকল্পনা। কিছু কর্মকর্তা এর বিরোধিতা করেছেন। কারণ এতে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে বন্যার সময়। প্রকাশ সিং বলেন, কুমির বা সাপ কীভাবে ভারতীয় ও বাংলাদেশি নাগরিকদের আলাদা করবে? এটা একেবারেই হাস্যকর প্রস্তাব।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, যেখানে বেড়া দেয়া সম্ভব নয়, সেখানে এই পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার নদীপথ ও জলাভূমি এলাকায় নজরদারি কঠিন হওয়ায় এ ধরনের উদ্যোগ ভাবা হচ্ছে। তিনি বলেন, এটি সীমান্ত নিরাপত্তায় ‘প্রতিরোধ-প্রথম’ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

নির্বাচনী প্রচারে বড় ইস্যু
বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। অমিত শাহ বলেন, এই অনুপ্রবেশকারীরা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তারা গরিবদের চাকরি ও রেশন কেড়ে নিচ্ছে। আমরা সরকার গঠন করলে পশ্চিমবঙ্গ ও সারা দেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেব।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন