পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব মঙ্গলবার জানিয়েছেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা মূলত যৌথ সংযম, দায়িত্ববোধ এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে ২৭৫তম কোর কমান্ডারস সম্মেলনের পর এ তথ্য জানায়। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বলে আইএসপিআর জানায়। এই মন্তব্য এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত চলমান। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে সংঘাত শুরু হয়ে পরে তা আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেয়। বর্তমানে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির কারণে সংঘাত সাময়িকভাবে থেমে আছে, যদিও তা বারবার পরীক্ষার মুখে পড়ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব
কোর কমান্ডারস সম্মেলনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আইএসপিআর জানায়, উদীয়মান ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সংযম, উত্তেজনা এড়ানো এবং পরিস্থিতির অবনতি রোধে উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তারা বলেন, স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। আইএসপিআর আরও জানায়, সম্মেলনে পুনর্ব্যক্ত করা হয়- আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা যৌথ সংযম, দায়িত্ববোধ এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সভাপতির বক্তব্যে অসিম মুনির পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চমানের প্রস্তুতি, পেশাদারিত্ব এবং যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে কমান্ডার ও ইউনিটগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার, সতর্কতা ও সফলতার প্রশংসা করেন।
অপারেশন ‘গাজাব লিল-হক’
আইএসপিআর জানায়, বৈঠকে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয় এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, বর্তমান অপারেশনাল গতি বজায় রেখে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস, তাদের সহায়ক অবকাঠামো ভেঙে দেয়া এবং পাকিস্তানের ভেতরে তাদের কার্যক্রমের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে।
অংশগ্রহণকারীরা ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’-এর মাধ্যমে সন্ত্রাসী ও তাদের অবকাঠামোর ধারাবাহিক দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। এই সামরিক অভিযানটি ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে আফগান তালেবানের সীমান্তপারের গুলিবর্ষণের পর শুরু হয়। এতে সন্ত্রাসীদের আস্তানাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ইসলামাবাদ বারবার অভিযোগ করেছে, কাবুল নিষিদ্ধ সংগঠন তেহরিকে তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) আশ্রয় দিচ্ছে। গত দুই বছরে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে পূর্ব আফগানিস্তানে টিটিপির উপস্থিতির কথা বলা হলেও তালেবান এ অভিযোগ অস্বীকার করে।
আইএসপিআর জানায়, সম্মেলনে বলা হয় আফগান তালেবান সরকারের অযৌক্তিক ও বিকৃত নীতি, যার মাধ্যমে তারা খারিজি ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে, তা উল্টো ফল দিচ্ছে এবং এখন পুরোপুরি প্রকাশিত হয়ে গেছে।
‘ভ্রান্ত প্রচারণা’ প্রত্যাখ্যান
সম্মেলনে আফগান তালেবানের সেই প্রচার অভিযানের উল্লেখ করা হয়, যেখানে পাকিস্তানকে আফগানিস্তানে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। সামরিক নেতৃত্ব এসব অভিযোগকে সমন্বিত ভ্রান্ত তথ্য প্রচারণা হিসেবে উল্লেখ করে, যার উদ্দেশ্য তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করা এবং নিজেদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে উপস্থাপন করা।
আইএসপিআর জানায়, এই অমূলক অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ কেবল অনুপ্রবেশকারী, সন্ত্রাসী আস্তানা ও সহায়ক অবকাঠামোর বিরুদ্ধেই পরিচালিত।
‘মারকা-ই-হক’ ও জাতীয় ঐক্য
আইএসপিআর জানায়, বৈঠকের অংশগ্রহণকারীরা ‘মারকা-ই-হক’-এর প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে জাতি ও সশস্ত্র বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এটিকে জাতীয় ঐক্য, সম্মিলিত দৃঢ়তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার অটল অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ‘মারকা-ই-হক’ বলতে গত বছর পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংঘাতকালীন সময়কে বোঝানো হয়। এটি ২২ এপ্রিল পেহেলগাম হামলার মাধ্যমে শুরু হয়ে ‘অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস’ শেষ হওয়ার পর ১০ মে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়। সম্মেলনে বলা হয়, এই স্মরণোৎসব ভারতের অহংকারী রাজনৈতিক মানসিকতার প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা- পাকিস্তান জাতি ঐক্যবদ্ধ, দৃঢ় এবং সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
কাশ্মীর ইস্যু ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
আইএসপিআর জানায়, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চলমান নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব। একই সঙ্গে কাশ্মীরিদের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। তাদের অতুলনীয় আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়, শহীদদের এই উত্তরাধিকারই পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা, ঐক্য ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির নির্দেশনা
বৈঠক শেষে অসিম মুনির কমান্ডারদের সর্বোচ্চ সতর্কতা, অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং পরিবর্তিত হুমকির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। তিনি পেশাগত উৎকর্ষতা, সমন্বিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এবং প্রচলিত ও অপ্রচলিত উভয় ধরনের হুমকির মোকাবিলায় সক্রিয় পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

Susanta bikash barua
২ মাস আগেপাকিস্তান ইতিমধ্যে ৪ বিলিয়ন পেয়েছে। ইরানের সাথে বানিজ্য করিডোর খুব ভাল কাজ হবে। চিনের সাথেও বানিজ্য সড়ক আছে। আমেরিকার আগ্রাসী ইচ্ছার বিরোদ্ধে এশিয়ার একটা ভাল প্রস্তুতি দরকার।