কালবৈশাখীর তাণ্ডবে একই পরিবারের তিনজনসহ নিহত ৫

কালবৈশাখীর তাণ্ডবে একই পরিবারের তিনজনসহ নিহত ৫

ফন্ট সাইজ:

মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখীর তাণ্ডবে জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁয় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ফেনী ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্নস্থানে ঘরবাড়ি, গাছপালা এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রোববার রাতে ওই সকল এলাকায় কালবৈশাখী আঘাত হানে। এতে জামালপুরে গাছ চাপায় ২ মেয়েসহ মায়ের মৃত্যু হয়। একইভাবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও নওগাঁর আত্রাইয়ে দুই নারী প্রাণ হারান।

বিস্তারিত পাঠিয়েছেন মানবজমিনের প্রতিনিধিরা-
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, মেলান্দহ উপজেলায় বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে বসতবাড়ির উপর গাছ ভেঙে পড়ে মা ও দুই মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারা। রাত সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের দাগী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেনÑ দাগী এলাকার মৃত গনি মণ্ডলের স্ত্রী খুকি বেগম (৬৫) এবং তার দুই মেয়ে ফরিদা আক্তার (৪০) ও ফতে আক্তার (৩৭)।

রোববার রাতে নিজ বসতঘরের একই বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন মা ও দুই মেয়ে। রাত গভীর হলে হঠাৎ শুরু হয় দমকা হাওয়া ও বৈশাখী ঝড়। একপর্যায়ে ঘরের পাশের একটি বড় মেহগনি গাছ উপড়ে টিনের ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা তিনজনই গাছের নিচে চাপা পড়েন। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। রাতের অন্ধকার ও ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকাজ সম্ভব হয়নি। পরে সকালে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন এবং তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন।

মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল আরা জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে সহায়তার বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হবে।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, আত্রাইয়ে কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ ভেঙে বেদে সম্প্রদায়ের তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা আরাফাতুন (২১) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যায়। এর আগে ভোরে সরকারি কলেজ মাঠ সংলগ্ন আত্রাই নদীর তীরে বেদে পল্লীতে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, আত্রাই নদীর তীরে বেদে সম্প্রদায়ের ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। হঠাৎ করে ভোরের দিকে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় একটি ইউক্যালিপ্টাস গাছ ভেঙে পড়লে তার নিচে চাপা পড়েন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ওই নারী। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যায়। এ বিষয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, ঝড়ে গাছ পড়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যুর বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তাদেরকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, উল্লাপাড়ায় দেড় মিনিটের ঝড়ে শয়ন ঘরের উপর গাছ ভেঙে নিচে পড়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোর রাতে উপজেলার বালসাবাড়ী পুকুরপাড়া গ্রামে হাবিবুর রহমানের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। মৃত নাছিমা খাতুন (৪৫) হাবিবুর রহমানের স্ত্রী।

এ ছাড়াও উপজেলার কয়রা, বাঙ্গালা, সলঙ্গা, রামকৃষ্ণপুর, পূর্ণিমাগাঁতী ও বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দেড় মিনিটের ঝড়ে কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছপালা ও প্রায় তিন শতাধিক বিঘা জমির ফসলের আংশিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমি জানান, বেশ কিছু মাঠে ধান গাছ পড়ে গিয়ে ফসলের আংশিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। উল্লাপাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোক্তারুজ্জামান বলেন, সোমবার ভোর রাতে ঝড়ে গাছ ভেঙে নিচে পড়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। লাশ উদ্ধার করে তার পরিবার সৎকারের ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে জনপদ। ঝড়ে অসংখ্য গাছপালা উপড়ে ভেঙে পড়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতঘর। রোববার সন্ধ্যা সাতটার দিকে শুরু হওয়া এই ঝড়ে পুরো জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকায় ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সোমবার বিকাল পর্যন্ত এখনো উপজেলাগুলোর অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হয়নি।

জানা গেছে, কালবৈশাখী ঝড়ে ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরশুরাম পৌর এলাকার বাসপদুয়া, গুথুমা এবং মির্জানগর ইউনিয়নের সত্যনগর, নিজকালিকাপুর, চিথলিয়া ও বক্স মাহমুদ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ঝড়ের তীব্রতায় গাছ উপড়ে বসতঘরের ওপর পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গুথুমা গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের জানান, তাদের গ্রামে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে ট্রান্সফরমার মাটিতে পড়ে গেছে। বাসপদুয়া গ্রামের রাশেদুল ইসলাম ডলার ও নিজ কালিকাপুর গ্রামের রমজান আলী বলেন, গাছ পড়ে ঘরবাড়ি ও পল্লী বিদ্যুতের লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই পুরো উপজেলা অন্ধকারে নিমজ্জিত। পরশুরাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মু. সুহেল আখতার বলেন, ঝড়ে ৩৩ কেভি লাইনসহ সব ১১ কেভি লাইনে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। একাধিক স্থানে খুঁটি ভেঙে যাওয়া এবং লাইনের উপর গাছ পড়ে থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এদিকে ফুলগাজীতেও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঝড়ের কারণে মুন্সীরহাট-নোয়াপুর সড়কের অন্তত পাঁচটি স্থানে বড় গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গাছ অপসারণে কাজ শুরু করেন। ফুলগাজী ফায়ার সার্ভিসের ওয়ারহাউজ ইন্সপেক্টর মো. তারেকুল ইসলাম বলেন, সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে আমাদের টিম নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ফুলগাজী জোনের ডিজিএম মো. হাবিবুর রহমান জানান, উপজেলার ১০টি ফিডারের সবগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাইনের ওপর গাছ উপড়ে পড়ায় পুরো উপজেলা বিদ্যুৎহীন। মাঠকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে সংস্কার কাজ চালালেও সংযোগ স্বাভাবিক হতে কতো সময় লাগবে, তা এখনো নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

এ ছাড়া জেলার সদর উপজেলা, দাগনভুঞা ও সোনাগাজীতেও তাণ্ডব চালিয়েছে ঝড়টি। এতে নানা স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হঠাৎ এই দুর্যোগে ফেনীর হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ না থাকায় ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, গত রাতের কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার বিভিন্ন জায়গায় ক্ষয়ক্ষতির খবর আসছে। ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে তিনটি ঘর। এতে খোলা আকাশের নিচে কাটছে অসহায় পরিবারের দিন। উপজেলার পোড়াকান্দুলিয়া ইউনিয়নের তারানগর গ্রামে রোববার রাতে আকস্মিক ঝড়ের তাণ্ডবে তাজুল ইসলামের পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। ঝড়ের তাণ্ডবে তাদের বসতঘরসহ তিনটি ঘর সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন