বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে দেশে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো হবে এবং লোডশেডিং কমে আসবে। সেই সঙ্গে দেশের পতিত সব সরকারি জমির তালিকা হচ্ছে। এসব জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেয়া হবে। তিনি বলেন, এখন একমাত্র সমাধান সৌরবিদ্যুৎ। তাই সব মন্ত্রণালয়ের অব্যবহৃত জমির তালিকা করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। রেলওয়ে সবচেয়ে বড় জমিদার, তাদের অনেক জমি পড়ে আছে, এসব বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সোমবার গুলশানের একটি হোটেলে চতুর্থ বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামের সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এতে সভাপতিত্ব করেন। সভায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও করণীয় বিষয় উঠে আসে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে ৯০০ একর জমি পড়ে আছে। এসব জমি আমরা বেসরকারি খাতে দেবো। কেননা, আগামী পাঁচ বছরে আমরা ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাই।’ লোডশেডিংয়ের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমার কপাল খারাপ। দায়িত্ব নেয়ার পরই লোডশেডিং শুরু হয়েছে। সরকারি খাতে ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পড়ে আছে। তাই বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো তেল-কয়লা কিনতে পারছে না। তবে আগামী সপ্তাহে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে। লোডশেডিং ৮০০-৯০০ মেগাওয়াটে কমিয়ে আনা হবে।’
বিদ্যুৎ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে বলেও জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ প্রণোদনা ও কর সুবিধা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি, বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এই উদ্যোগে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ খাতে চাপ কমবে এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে দেশ এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন জ্বালানিমন্ত্রী।
সোলার বিদ্যুতকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় জমি ও সুবিধা দেবে এবং বৃহৎ পরিসরে সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। এ লক্ষ্যে সরকারি- বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বর্তমান বিদ্যুৎ খাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রাইভেট বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া, ডলার সংকট এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। অতীতে কিছু নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো বিদ্যুৎ খাতে রয়ে গেছে।
এদিকে, দেশে শিল্প পর্যায়ে সোলার বিদ্যুৎ উন্নয়নে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, সরকারি অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করে পিপিপি মডেলে বড় পরিসরে সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে জমি সংকট শিল্প পর্যায়ের সোলার প্রকল্পে বড় বাধা ছিল। এই সমস্যা সমাধানে ইতিমধ্যে একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যার আওতায় ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য সরকারি জমি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে জমি পুনরায় সরকারের কাছে ফিরে আসবে। তিনি আরও জানান, ফেনীর সোনাগাজীতে প্রথম পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা অব্যবহৃত জমির একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে কবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা কেউ বলতে পারবে না। তাই নবায়নযোগ্য খাতে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি।’ দেশে বিদ্যুতের চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা কাজে লাগছে না। জ্বালানি সংকট, বকেয়া বিল ও কারিগরি ত্রুটির কারণে সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
