হাওরে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান, কাঁদছে কৃষক

হাওরে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান, কাঁদছে কৃষক

ফন্ট সাইজ:

বিস্তীর্ণ হাওর। চোখ যেদিকে যায়, পানির নিচে শুধু ধান আর ধান। দুই দিন আগেও এসব ধান বাতাসে দুলছিল। সোনালি রঙ ধারণ করা ধানের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছিল হাওর জুড়ে। পাকা ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কৃষকেরা। এরই মধ্যে ঘটে যায় সর্বনাশ। টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান। এরই মধ্যে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টর বোরো জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের এসব জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেছে। একইভাবে এর সীমান্তবর্তী হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শিবপুর ও মাদনা এলাকায় আরও ৫০০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।

খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকেরা ‘গলাডোবা’ ধান কাটছেন। নৌকা দিয়ে ধান কেটে পাড়ে আনা হচ্ছে। অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ করে কোনো রকমে কেউ কেউ ধান কেটে তুলছেন। অনেক জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। যে ধান কয়েক দিনের মধ্যে ঘরে তোলার কথা ছিল, তা এখন পানির নিচে। হাঁটু বা কোমড় পানিতে নেমে কেউ কেউ ধান কাটলেও অনেক কৃষকই আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আব্দুল্লাহপুর হাওরে এবার ১০ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন কৃষক রতন মিয়া (৬৫)। পুরো পরিবারের খাওয়া-দাওয়া, সন্তানদের লেখাপড়াসহ সব খরচই চলে এই ধান থেকে। কিন্তু শ্রম-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার তলিয়ে গেছে পানিতে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি। সামনে একটি বছর কীভাবে চলবে, ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবেন- এই দুশ্চিন্তায় দিশাহারা রতন মিয়া। শুধু রতন মিয়াই নন, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তার মতো ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজারো কৃষক। পরিবেশ না মেনে হাওরে উঁচু রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পলি জমে নদী ভরাট হওয়া এবং ফসলরক্ষার বাঁধের ত্রুটির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রতন মিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময়ে ভেজা কাপড়ে ধানক্ষেত থেকে উঠে আসেন কাবিল মিয়া (৬০)। হাতে থাকা আধাপাকা ধান দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দেহুইন, দুই-একদিন গেলেই কাটার চেষ্টা করতাম। পানির নিচের ধান এহন কেমনে কাটাম? ধান পইচ্চা কালা অয়া যাইতাছে। চোখের সামনে ধান নষ্ট অইয়া যাইতাছেÑ কইলজাডারে মানাইতে পারতেছি না।’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একই গ্রামের কৃষক হযরত আলী (৫৫) বলেন, উজানের পানি নামলেই এই হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। হবিগঞ্জ সীমান্তের শিবপুর এলাকার খোয়াই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছরই অষ্টগ্রাম অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। লাখাই উপজেলার শিবপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম (৪৮) জানান, তার ৯ একর জমির মধ্যে সাত একরই তলিয়ে গেছে। পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে জমিতে পানি জমে থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে। একই এলাকার কৃষক রমজান আলী (৬০) বলেন, দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার বোরো আবাদ করেছিলেন। ধান বিক্রি করেই ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু ধান পাকতে শুরু করতেই তা পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন ঋণ শোধ ও সংসার চালানো- দুটোই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে, পাকা ধান তলিয়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে সঠিক হিসাব নেই। তাদের দাবি, দুই দফায় জলাবদ্ধতায় প্রথমে ২০ হেক্টর এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে আরও ৯ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। তবে এ হিসাবকে হাস্যকর বলছেন কৃষকেরা। কৃষকদের দাবি, সব মিলিয়ে দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর বোরো জমির ধান তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ৮৯ টন। বৈশাখের শুরু থেকেই হাওরে ধান কাটা শুরু হয়। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় অষ্টগ্রামের হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। তিনি জানান, ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে, এর আগে পানি নেমে গেলে ক্ষতি কম হতে পারে।


ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন