বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে নারায়ণগঞ্জ। একসময় ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ নামে খ্যাত এই শহরটি ছিল দেশের পাটশিল্প ও নদীবন্দরনির্ভর অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। সময়ের প্রবাহে বদলেছে অনেক কিছু। তবে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে নারায়ণগঞ্জ আজও গুরুত্বপূর্ণ।
পাটের সোনালি দিন
একসময় নারায়ণগঞ্জ ছিল বিশ্বের অন্যতম পাট শিল্পের কেন্দ্র। বৃটিশ আমলে নদীবন্দর ও ভৌগোলিক সুবিধার কারণে এখানে গড়ে ওঠে অসংখ্য পাটকল, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই সোনালি দিন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন- পাটশিল্প কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
সেকালের জৌলুস
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ ছিল পাট রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র। শীতলক্ষ্যা নদীঘেঁষা এই শহরের নদীবন্দর দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাট এসে জমা হতো, নদী ঘেঁষে গড়ে ওঠা আদমজী জুট মিলসহ পাটকলগুলো থেকে উৎপাদিত হতো পাটের সুতা, বস্তা ও বিভিন্ন পণ্য। সেই পণ্য রপ্তানি হতো ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এ কারণেই স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহরের সঙ্গে তুলনা করে নারায়ণগঞ্জকে বলা হতো ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’। আদমজী জুট মিলসের মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান একসময় এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল হিসেবে পরিচিত ছিল। হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটশিল্প ছিল দেশের ‘সোনালি আঁশ’র প্রধান চালিকাশক্তি।
অবক্ষয়ের শুরু
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে নানা কারণে পাট শিল্পে ধস নামে। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, আধুনিকায়নের অভাব এবং সিন্থেটিক পণ্যের আগ্রাসনে পাটের চাহিদা কমতে থাকে। একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে ২০০২ সালের ৩০শে জুন আদমজী জুট মিল্স বন্ধ হয়ে যাওয়াকে পাট শিল্পের ইতিহাসে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়। এতে হাজারো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে এবং পুরো শিল্পখাত সংকটে পড়ে যায়।
একাল: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাট আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। পাট থেকে তৈরি ব্যাগ, কার্পেট, জিও-টেক্সটাইলসহ নানা বহুমুখী পণ্যের বাজার তৈরি হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু নতুন কারখানা চালু হলেও পুরনো গৌরব এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যকর বিপণনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের পাটশিল্প আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতিমালা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পাটশিল্প আবারো দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে পরিচিত এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
নের নতুন রূপ
অতীতে নারায়ণগঞ্জের কদর ছিল শুধু ব্যবসায়িক নয়, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও। নদী, খাল, নৌযান ও শ্রমজীবী মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকতো পুরো বন্দর এলাকা।
স্বাধীনতার পর নানা কারণে পাট শিল্পের পতন ঘটে। বন্ধ হয়ে যায় অনেক ঐতিহ্যবাহী পাটকল, যার মধ্যে আদমজী জুট মিল্সও অন্যতম। তবে থেমে থাকেনি নারায়ণগঞ্জ।
বর্তমানে এই শহর গড়ে উঠেছে তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম হাব হিসেবে। অসংখ্য গার্মেন্টস কারখানা, ডাইং, টেক্সটাইল ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে এই খাত।
এ ছাড়া সড়ক ও নৌপথের উন্নয়ন, নতুন আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে ওঠায় নারায়ণগঞ্জ এখন একটি আধুনিক নগরীতে রূপ নিয়েছে।
নদীবন্দর ও নগর জীবনের পরিবর্তন
একসময় শীতলক্ষ্যা নদী ছিল প্রাণবন্ত ও পরিষ্কার। এখন শিল্পায়নের ফলে দূষণের চাপ বেড়েছে, যা পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে নদীভিত্তিক বাণিজ্য এখনো চালু রয়েছে এবং বন্দরনগরীর ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
ঐতিহ্য ও চ্যালেঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস যেমন গৌরবময়, তেমনি বর্তমানও সম্ভাবনাময়। তবে শিল্প দূষণ, যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়নসহ নানা সমস্যা শহরটির টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে আছে।
তারপরও ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’খ্যাত নারায়ণগঞ্জ আজও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অতীতের ঐতিহ্য ও বর্তমানের উন্নয়নকে সমন্বয় করে ভবিষ্যতে আরও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে ওঠাই এখন সময়ের দাবি।
সেকালের পাটশিল্প আর একালের পোশাকশিল্প- এই দুই ধারার সংমিশ্রণেই নারায়ণগঞ্জের পরিচয়। ইতিহাসের গৌরব বুকে নিয়ে আধুনিকতার পথে এগিয়ে চলা এই শহরই বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মোটকথা নারায়ণগঞ্জ শুধু একটি শহর নয়- এটি ইতিহাস, শ্রম, শিল্প ও মানুষের সংগ্রামের প্রতীক। শীতলক্ষ্যার ঢেউয়ের মতোই এগিয়ে চলা এই নগরী অতীতের গৌরব ধারণ করে ভবিষ্যতের নতুন সম্ভাবনার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
