পূর্ব-আকাশে তখনও সূর্যের দেখা মেলেনি। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ব্যস্ত বাঙ্গি তুলতে। ব্যস্ততার কারণ সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই ক্ষেত থেকে বাঙ্গি তুলতে হবে। এরপর বিক্রির জন্য নিতে হবে হাটে। নয়তো বাঙ্গিগুলোর ক্রেতা পাওয়া যাবে না। প্রতিদিন এমন দৃশ্য দেখা যায় ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কৈলাইল ইউনিয়নের ভাঙাভিটায়। রসালো ও সুস্বাদু হওয়ায় এ গ্রামের বাঙ্গির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা জেলাসহ সারা দেশে। গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছেন বাঙ্গির গ্রাম হিসেবে। এ বছরও ২০৩ হেক্টর জমির ঊর্বর এঁটেল মাটিতে আবাদ করা হয়েছে এ বাঙ্গি।
এ অঞ্চলের কৃষকদের খুব ভোর থেকেই শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করা হয় ঐতিহ্যবাহী ‘চিনাই’ ও গোল বাঙ্গি। এখানে প্রথাগত হাট না বসলেও সকাল-বিকেল দুই বেলা ভাঙ্গাভিটা সেতুতে বসে জমজমাট আড়ত। যেখান থেকে স্থানীয় পাইকার ও খুচরা ব্যাবসায়ীরাসহ ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যান এই বিখ্যাত বাঙ্গি। এছাড়াও কৃষকরা জমি থেকে বাঙ্গি তুলে সড়কের পাশে বসেই বিক্রি করছেন পাইকার ও খুচরা ক্রেতাদের কাছে। ?এবার পাইকারদের ব্যবসা জমজমাট হলেও, কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। প্রতিকূল আবহাওয়া আর পর্যাপ্ত রোদের অভাবে এবার বাঙ্গি পাকতে দেরি হয়েছে।
অনেক বাঙ্গি মাঠেই নষ্ট হচ্ছে। ?ভাঙ্গাভিটার এই সোনালী ফসলের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। নির্মাণাধীন একমাত্র সরু সড়ক দিয়ে পণ্য আনা- নেয়া করা কঠিন। আবার সিরাজদিখানের কামারগাঁও ১০০ ফিট থেকে তুলশিখালী পর্যন্ত সড়ক সংযোগ না থাকায় এবং ইছামতি নদীর শাখার ওপর সেতু না থাকায় সরাসরি ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে যাতায়াত বিড়ম্বনায় পানির দরে পণ্য ছাড়তে হচ্ছে তাদের। পণ্য পরিবহনেও পোহাতে হচ্ছে চরম বিড়ম্বনা। মৌসুমের শুরুতে প্রতি ঝাঁকা বাঙ্গি ২৫০০-৩৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ১০০-৩০০ টাকায়। কৃষকরা জানান, এ অঞ্চলের প্রধান ফসল বাঙ্গি ও রসুন। তবে আমন ধান, ধৈনা, ও কালিজিরাসহ বিভিন্ন মওসুমি ফসলের আবাদ করেন তারা। কয়েক দশক ধরে চাষাবাদ করলেও উপজেলা কৃষি অফিস থেকে মেলে না কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা। যেন দেখার কেউ নেই।
মূলত এঁটেল মাটির গুণের কারণেই এখানে বাঙ্গি ছাড়াও রসুন, ধনিয়া ও কালিজিরার বাম্পার ফলন হয়। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে এই বিশাল কৃষি সম্ভাবনা জায়গাটি। স্থানীয়রা মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী ভাঙাভিটার এই বাঙ্গিপল্লী টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন উন্নত সড়ক যোগাযোগ, কৃষি বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা ও নজরদারি এবং দ্রুত সড়ক ও সেতু নির্মাণ এখন ভাঙাভিটাবাসীর প্রাণের দাবি। তবেই বাঁচবে কৃষক, রক্ষা পাবে এই অঞ্চলের ঐতিহ্য। তবে উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আসমা জাহানের দাবি, নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা হয় ভাঙাভিটার কৃষকদের। তিনি বলেন, আমাদের ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কর্মকর্তা রয়েছে তিনি আজও গিয়েছেন।
