সিলেটে হাম উপসর্গ নিয়ে একদিনেই মারা গেছে তিন শিশু। এটি ঘটেছে গত শুক্রবার থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায়। একইসঙ্গে রোগী ভর্তি ও ল্যাব টেস্টে আক্রান্ত রোগীও বাড়ছে। ফলে চার মাসের যে স্থিতিশীল পরিসংখ্যান ছিল সেটি হঠাৎ করেই বেড়ে চলেছে। এ নিয়ে শঙ্কা জেগেছে। অন্যদিকে- হামের জন্য বিশেষায়িত আইসোলেশন সেন্টারেও দিন দিন রোগী বেড়েই চলেছে। গতকাল দুপুরে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের তথ্য মতে- গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে একজন সিলেটের জালালাবাদ টুকেরবাবাজার এলাকার লুকমান মিয়ার মেয়ে ৯ মাস বয়সী হুমায়রা।
তাকে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মাটিয়াপুর গ্রামের জাহির মিয়ার ১০ মাস বয়সী ছেলে আরিফ ও একই উপজেলার আনসার মিয়ার ছেলে ৫ মাস বয়সী তৌফিক। হামের উপসর্গ নিয়ে ওসমানী হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসার পর মারা যাওয়া তিন শিশুকে শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় তাদের শামসুদ্দিন থেকে ওসমানী হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি করা হলে তারা মৃত্যু বরণ করেন। অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন- শামসুদ্দিন হাসপাতালে সর্বশেষ চিকিৎসা পিআইসিইউ না থাকার কারণে গুরুতর অবস্থায় রোগীকে ওসমানীতে নিয়ে আসা হয়।
এতে রোগীর চিকিৎসার ক্ষতি হয়েছে। এজন্য শামসুদ্দিনে পিআইসিইউ সুবিধা গড়ে তোলার দাবি জানান তারা। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মাহবুবুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- হাসপাতালে এখনো ১০ শিশু পিআইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা গুরুতর। এখন পর্যন্ত যে রোগীর চাপ রয়েছে সেটি তারা ১০ শয্যাবিশিষ্ট ওই পিআইসিইউ ওয়ার্ড দিয়ে সামাল দিতে পারছেন। যদি রোগীর চাপ বাড়ে তাহলে বড় পরিসরে চিন্তা করা যাবে বলে জানান তিনি। এদিকে- সিলেটে হামের আইসোলেশন সেন্টার শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল বলতে গেলে এখন পুরোটাই হামের রোগীর জন্য বরাদ্দ। একশ’ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালের বর্তমানে রোগী রয়েছেন ৯০ জন। তাদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে হামের রোগীর সর্বশেষ চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে পিআইসিইউ স্থাপন করা হয়নি। করোনার সময় হাসপাতালে ২০টি আইসিইউ চালু করা হয়েছিল।
এখন সেখানে ১৬টি আইসিইউ রয়েছে। তবে পিআইসিইউ’র আনুষঙ্গিক সুবিধা ও দক্ষ জনবল না থাকায় সেগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে মুমূর্ষু অবস্থায় পিআইসিইউ সুবিধা দিতে রোগীকে ওসমানী হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। তবে জেলা সিভিল সার্জনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- শামসুদ্দিনে রোগীর সেবা নিরবচ্ছিন্ন করতে হাসপাতালে সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে ৩ জন ও ওসমানী হাসপাতাল থেকে আরও ৩ জন ডাক্তার দেয়া হয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান শনিবার সকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- একশ’ শয্যাবিশিষ্ট তার এই হাসপাতালে রোগী ভর্তির এখনো সুযোগ আছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। যাদের অবস্থা ক্রিটিক্যাল তাদের ওসমানীর পিসিআইসিউতে পাঠানো হয়। তিনি বলেন- তার হাসপাতালে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা এসে ভর্তি হচ্ছে। দিন দিন রোগী বাড়ছে। একইসঙ্গে চিকিৎসাও দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এজন্য তাদের প্রস্তুতিও রয়েছে। সিলেটে ল্যাবে পরীক্ষায় নতুন করে আরও ২৩ জনের শরীরে হাম-রুবেলার সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শনিবার বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে বিভাগ জুড়ে মোট ১৬৯ জন সন্দেহজনক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৯০ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯ জন, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ২২ জন এবং সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১৩ জন রয়েছেন। অন্যান্য উপজেলা ও বেসরকারি হাসপাতালেও ছড়িয়ে আছে বাকি রোগীরা। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদ হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- সিলেটে হামের প্রকোপ কিছুটা বেড়েছে। তবে এতে আমরা বিচলিত নই। এরইমধ্যে হামের টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। সিলেট নগরেই ৬৮ হাজার ৪০০ জন শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।
প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা দেয়া চলছে। আশা করা হচ্ছে টিকাদান কর্মসূচির সফলতা আগামী দুই মাসের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। সিলেটের সিভিল সার্জন নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন- সিলেটে যে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে সেগুলো ঢাকায় ল্যাব টেস্টে পাঠানো হচ্ছে। এখনো ১০ থেকে ১৫ ভাগ রিপোর্ট আসেনি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীরা চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরছেন। সিলেটে হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি বলে জানান তিনি।
