উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশযাত্রা- কিন্তু সেই স্বপ্নই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ এলাকার মাসুদ মাতবরের জীবনে। ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অপহরণকারীদের কবলে পড়েন তিনি। এখন তার পরিবারের কাছে দাবি করা হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ। টাকা না দিলে তাকে হত্যা করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মাসুদ মাতবর দীর্ঘদিন কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ বাজারে একটি মুদি দোকান পরিচালনা করতেন। ব্যবসা ভালো চললেও আরও ভালো জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে সফল না হয়ে একপর্যায়ে এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে এক দালালের সঙ্গে পরিচয় হয়। ওই দালাল কোনো ঝামেলা ছাড়াই ইতালি পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দেয়। বিনিময়ে ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে অর্ধেক অর্থ জোগাড় করা হলেও বাকি টাকা সংগ্রহের জন্য নিজের মুদি দোকান বিক্রি করেন মাসুদ। সব টাকা পরিশোধের পর দালাল চক্রের মাধ্যমে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই তাকে অপহরণ করা হয়। বর্তমানে অপহরণকারীরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করছে। টাকা না দিলে তাকে হত্যা করে মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। এতে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি।
অপহরণের পর মাসুদকে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের কাছে পাঠানো ভিডিওতে দেখা যায়, পা বেঁধে উপরের দিকে ঝুলিয়ে লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছে। নির্যাতনের সময় তাকে চিৎকার করতে শোনা যায় এবং জীবনভিক্ষা চাইতেও দেখা গেছে বলে দাবি স্বজনদের।
নির্যাতনের একটি ভিডিও মানবজমিনের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পা বাঁধা অবস্থায় তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হচ্ছে। অসহায় অবস্থায় তিনি চিৎকার করে ‘মারে, বাবারে’ বলে আর্তনাদ করছেন। বারবার তাকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দিতে শোনা যায়। নির্যাতনের সময় তার ওপর শারীরিকভাবে কঠোর আচরণ করা হচ্ছে এবং ভীতি সৃষ্টি করে কথা বলানো হচ্ছে বলেও ভিডিওতে প্রতীয়মান হয়। পুরো ঘটনাটি ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে দ্রুত মুক্তিপণ আদায় করা যায়।
ভিডিওটি দেখার পর পরিবার আরও ভেঙে পড়েছে। মাসুদের ভাই মেহেদী জানান, ওকে এমন অবস্থায় দেখে আমরা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছি। তারা স্পষ্ট বলেছে, কোনোভাবেই তাকে বাঁচানো যাবে না। তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে আমরা কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না। আসলে আমার ভাই এখনো বেঁচে আছে কিনা, সেটাও আমরা নিশ্চিত নই। নির্যাতনের যে ভিডিও পাঠানো হয়েছে, সেটি কবে ধারণ করা হয়েছে তাও জানা নেই। গত কয়েকদিন যে নম্বর থেকে ফোন আসছিল, এখন সেটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মাসুদের ভাই মেহেদী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ওকে ওই অবস্থায় দেখার পর থেকে আমরা কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না, খেতেও পারছি না। মনে হচ্ছে যেন আমাদের পৃথিবীটাই থেমে গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। কী করবো, কোথায় যাবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
মাসুদের পরিবার দ্রুত সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এবং তাকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আকুল আবেদন জানিয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনীতে।
