১৩ বছরেও শেষ হয়নি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি

১৩ বছরেও শেষ হয়নি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ

ফন্ট সাইজ:

এক যুগ পেরিয়ে গেছে। তবুও শেষ হয়নি দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ধসের বিচার। হত্যা ও ইমারত বিধি লঙ্ঘনের দুই মামলাই এখনো ঝুলে আছে। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, আর বিচারিক ধীরগতিতে দীর্ঘ হচ্ছে প্রতীক্ষা। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে মাত্র ১৪৫ জনের। সর্বশেষ গত ১৫ই এপ্রিল মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ছিল। তবে ওইদিন কোনো সাক্ষী আদালতে আসেননি। আদালত আগামী ১৫ই মে সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

এ বিষয়ে সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু মানবজমিনকে বলেন, ঘটনা যেহেতু একই এবং ইতিমধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে পর্যালোচনা করতে পারে- এগুলো মামলার প্রমাণের জন্য যথেষ্ট কিনা। যদি তারা মনে করে সাক্ষ্য যথেষ্ট, তাহলে অবশিষ্ট সাক্ষীদের বাদ দিয়ে আদালতের কাছে সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্তির আবেদন জানাতে পারে। আসলে সব সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া বাধ্যতামূলক নয়। ২৪শে এপ্রিল ভয়ানক রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর। ২০১৩ সালের এই দিনেই ঘটেছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল দুর্ঘটনা। ধসে পড়েছিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত রানা প্লাজা। প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমজীবী। সেইসঙ্গে আহত হয়েছিলেন আরও প্রায় ২ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে পঙ্গু হয়েছেন ৭৮ জন।

আদালত সূত্র জানায়, রানা প্লাজা ধসের পরদিন অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা করেন সাভার থানার এসআই আলী আশরাফ। ওই মামলায় সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া রানা প্লাজা ধসে নিহত হওয়ার ঘটনাকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে আদালতে আরেকটি মামলা করেন পোশাক শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলী আক্তার। আদালতের নির্দেশে একে অবহেলাজনিত মৃত্যু মামলার সঙ্গে একীভূত করে তদন্ত করে সিআইডি। আদালতে দায়ের করা হত্যা মামলার বাদী শিউলী আক্তার পুলিশের মামলার সাক্ষী। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে মাত্র ৯৪ জনের। ফলে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ পর্বই শেষ করতে পারছে না আদালত। সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখেও কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় আবারো পিছিয়েছে কার্যক্রম। ২০১৬ সালের ১৮ই জুলাই ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান ৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে হত্যা মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেন। এ মামলায় অভিযুক্ত ৪১ আসামির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন কেবল ভবন মালিক সোহেল রানা। আসামিদের মধ্যে রানার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কলু খালেক, আবু বক্কর সিদ্দিক ও আবুল হোসেন এরই মধ্যে মারা গেছেন।

অভিযোগ গঠনের পরপর সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেফায়েত উল্লাহ এবং তৎকালীন কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খানসহ ৮ জন মামলা বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করেন। তাদের আবেদনে হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করে। উচ্চ আদালতের ওই স্থগিতাদেশে আটকে যায় মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে ২০২২ সালের ৩১শে জানুয়ারি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার আদালতে এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। বর্তমানে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ হেলাল উদ্দিনের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন।
এ বিষয়ে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ইকবাল হোসেন বলেন, আগামী ১৫ই মে সাক্ষ্য দিতে ১৭ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর বিরুদ্ধে সমন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন নিহতদের পোস্ট মর্টেম করা চিকিৎসক ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তা। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি মামলা নিষ্পত্তি করতে। এজন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, এতদিনেও বিচার শেষ না হওয়ার পেছনে বিগত সরকারের অবহেলা ছিল। সাক্ষ্য গ্রহণ দ্রুত শেষ করে মামলার নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।

একই আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কালাম খান বলেন, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে প্রায় পাঁচ বছর মামলার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে আবারো সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে দ্রুত বিচার শেষ করা সম্ভব। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, রাষ্ট্রপক্ষ নিয়মিত সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। তারা দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। ২০১৬ সালের ১৮ই জুলাই ৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। এ মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও অধিকাংশ আসামি জামিনে বা পলাতক। এর মধ্যে কয়েকজন আসামি ইতিমধ্যে মারা গেছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন