দেশের কৃষি উৎপাদনে দীর্ঘদিন ধরে বড় সমস্যা হলো ইউরিয়া সারের ব্যাপক অপচয়। মাঠে প্রয়োগ করা ইউরিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ গাছ গ্রহণ করতে না পারায় বাতাসে উড়ে যায়, কিছু অংশ মাটির নিচে নিষ্কাশিত হয়ে পানিদূষণ ঘটায় কিংবা গ্রিন হাউজ গ্যাস হিসেবে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বৃদ্ধি তেমনি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবেশবান্ধব ন্যানো ইউরিয়া সার মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) পরিচালিত মাঠ পরীক্ষণে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ধান ফসলের প্রাথমিক সফলতা পেয়েছেন বলে জানান গবেষক দল।
জানা যায়, গবেষণায় ইউরিয়া সারের কণাকে ন্যানো আকারে (প্রায় ২০ থেকে ৫০ ন্যানোমিটার) রূপান্তর করে বায়োচার দ্বারা আবৃত করা হয়, যা ধীরে ধীরে নাইট্রোজেনমুক্ত করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে। ন্যানো-কার্বনকোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি অ্যামোনিয়া অপচয় ও গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। উদ্ভাবিত এই ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম ইউরিয়া সার ব্যবহার করেও সমপরিমাণ বা অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব, যা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া ধানের ফলন ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ফসলের গুণগত মান উন্নয়নের সম্ভাবনাও লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়ে প্রধান গবেষক ও বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ খায়রুল হাসান বলেন, প্রতি বছর সরকারকে ইউরিয়া সারে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়। কৃষকেরাও সবচেয়ে বেশি এই ইউরিয়া সারই ব্যবহার করেন। যা নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের জটিলতা বা সমস্যা দেখা দেয়। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সারের খরচ কমানো এবং পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে আমার গবেষণার কাজ শুরু করি। প্রাথমিকভাবে আমার যে অনুমান ছিল সেই অনুমানে মাঠ পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে আমরা সফল।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে আরও কিছু পরীক্ষণের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবো যে আমাদের এই ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তিটি কতোটুকু সফল হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী যে আগামী মৌসুমেই আমরা এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে পারবো। এটি যদি বৃহত্তর পরিসরে উৎপাদন করা যায় এবং মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করা যায় তবেই এটি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। বিশেষত বাংলাদেশে ধান চাষের জন্য এই ন্যানো ইউরিয়া সার একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এ বিষয়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মো. মনোয়ার করিম খান বলেন, এখানে ৮০ শতাংশ ন্যানো ইউরিয়া আর ১০০ শতাংশ প্রিল ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। যদি দুইটার ফলাফলকে আমরা পাশাপাশি রাখি তাহলে দেখতে পারবো যে উভয়ই প্রায় একই রকম ফলন দিচ্ছে। যদি ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা সাধারণ ইউরিয়ার মতোই ফলন পাই তাহলে এটাকে প্রিল ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারব। ব্রি’র গবেষণা উইংয়ের পরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম মূল লক্ষ্য ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা সূক্ষ্ম কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
