বহুমুখী সংকটে হাওরের কৃষক পাচ্ছেন না ধানের ন্যায্য দাম

ফন্ট সাইজ:

ধান উৎপাদনে ব্যয় বাড়লেও মিলছে না ন্যায্য দাম। এতে প্রতি বছর কৃষক বোরো আবাদে লোকসান দিয়ে যাচ্ছেন। এবার ভালো ফলন হলে সে ধকল কিছুটা কাটিয়ে ওঠার আশা কৃষকের। কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়েবালি। ব্রিধান-৮৮ এর বীজে মিশ্রণের ফলে ঘটেছে ফলন বিপর্যয়। হাওরের অনেক জায়গায় তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। এ ছাড়া ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে এবারো লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। কেবল ন্যায্য দাম নয়, একের পর এক সংকটে কাবু হাওরের কৃষক। দ্বিগুণ-তিনগুণ পারিশ্রমিক দিয়েও মিলছে না ধানকাটা শ্রমিক। ডিজেল সংকটের কারণে কাটাধান পরিবহন ও মাড়াইয়েও গুণতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। ব্যাপক দরপতন ও লোকসানের কারণে হাসি নেই হাওরের কৃষকের। দেশের অন্যতম প্রধান বোরো উৎপাদনকারী জেলা কিশোরগঞ্জ। কৃষি বিভাগ জানায়, এ বছর জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর অধ্যুষিত ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী-এ চারটি উপজেলায় আবাদ হয়েছিল প্রায় এক লাখ হেক্টর। সেখানকার ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে এবার আবাদ করা হয়েছিলো ব্রি-ধান ৮৮। এই ব্রি-ধান ৮৮ এর বীজে মিশ্রণের কারণে হাওরের প্রায় এক পঞ্চমাংশ কৃষক ফলন বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন।

কৃষকেরা জানান, হাওরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকেরা মূলত ধারদেনা ও মহাজনের কাছ থেকে সুদের ওপর ঋণ নিয়ে জমি চাষ করে থাকেন। ধান তোলার সঙ্গে সঙ্গেই তাদেরকে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু ধানের কম দাম তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই কারণে তারা মহাজনের ঋণ শোধ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। কৃষকেরা জানান, সারের চড়ামূল্য, সেচ খরচ, শ্রমিকের চড়া মজুরিতে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। কিন্তু ফসলের ন্যায্য দাম নেই। মূল্য কম-বেশি যাই হোক, মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতেই হয়। সরজমিন ঘুরে জানা গেছে, জেলার হাওরের অনেক কৃষক অন্যের জমি পত্তন নিয়ে বোরো আবাদ করেছেন। আবার অনেকে বিত্তশালীদের জমি বর্গা চাষ করেছেন। কৃষকেরা শ্রমিকের মজুরি আর মহাজনের ঋণ শোধ করতে গিয়ে ধানকাটা শুরু হওয়ার পর থেকেই নতুন ধান বিক্রি করছেন। প্রতি মণ মোটা ধানের সর্বোচ্চ মূল্য ৭০০ টাকা। চিকন ধানের দাম সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা। অথচ উৎপাদন ব্যয় পড়েছে ১০৫০ থেকে ১২০০ টাকা। তাই বর্তমান বাজারে সর্বোচ্চ দামেও তাদের উৎপাদন ব্যয় উঠবে না বলে জানান কৃষকেরা।

কৃষকেরা জানান, প্রতিটি কৃষক পরিবারের যেসব সদস্য চাষাবাদে শ্রম দেন, তারা নিজেদের মজুরিটা কখনোই টাকার মূল্যে হিসাব করতে শেখেননি। কেবল নগদ যে টাকাগুলো চাষাবাদে খরচ করেন, কেবল সেটাই হিসাবের মধ্যে ধরেন। তারপরও মৌসুমের শুরুর দিকে প্রতি মণ ধানে কম করে হলেও তাদের তিনশ’ টাকা ক্ষতি হয়। জানা গেছে, কৃষকরা বোরো আবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণগ্রহণ করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেন, এনজিও থেকেও ঋণ নেন। আবার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন চাতাল মালিক কৃষকদের মধ্যে আগাম লগ্নি করেন। ধানের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য নির্ধারণ করে এসব লগ্নির টাকা কৃষকদের হাতে তুলে দেন। আর নতুন ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এসব চাতাল মালিকের লোকদের হাতে কৃষকদেরকে পরিশ্রমের ধান তুলে দিতে হয়। এই সময় হাজার হাজার মণ ধান বড় বড় নৌকা বা কার্গোতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় হাওরাঞ্চলের ‘প্রবেশদ্বার’ বলে খ্যাত করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরে। সেখান থেকে ট্রাক এবং ট্রাক্টরে ভরে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলের চাতালে। আবার ধানকাটার মৌসুমে চামড়া নৌবন্দরে অস্থায়ী আড়ত খুলে বসেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা দালালের মাধ্যমে হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে সস্তায় ধান কিনে আড়তে গুদামজাত করেন। এখান থেকে সরবরাহ করেন বিভিন্ন বড় বড় চালকল বা চাতালে।

ইটনা উপজেলা সদরের বাঘাইহাটি গ্রামের কৃষক মহসীন মিয়া এবার ২ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। দক্ষিণবন্দে তার জমিতে ব্রি-ধান-১০২ রোপণ করেছিলেন। ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। কিন্তু ধানকাটা শ্রমিক মিলছে না। পার্শ্ববর্তী মৃধাহাটি গ্রামের জাকির হোসেন জানান, তিনি ৩ খের (৭৫ শতাংশ) জমিতে ব্রি-ধান-১০২ করেছিলেন। এইটুকু জমি করতে তার খরচ হয়েছে ৫৭ হাজার টাকা। অথচ ৮০০ টাকা মণ ধরে ধান বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৪২ হাজার টাকা। ১৫ হাজার টাকা তার লোকসান হয়েছে।

উপজেলার করনশী গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ধানকাটার জন্য তাদেরকে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয়েছে। ঘরে যে পরিমাণ ধান তারা তুলতে পারবেন বলে আশা করেছিলেন, তার এক চতুর্থাংশও তুলতে পারেননি। এর ওপর ধানের দাম কম হওয়ায় তারা দিশাহারা। তিনি বলেন, প্রতি বছর ভালো দাম পাওয়ার আশা করলেও আমরা বারবারই নিরাশ হচ্ছি। তবুও বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আমাদের বাধ্য হয়ে ধান চাষ করতে হচ্ছে। একই গ্রামের কৃষক আনোয়ার ঠাকুর জানান, উৎপাদিত ধানের বেশির ভাগই ধানকাটা ও মাড়াইয়ের মজুরির খরচ মেটাতে চলে যায়। এ ছাড়া মৌসুম জুড়ে হালচাষ, আবাদ, সার ও কীটনাশকসহ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট নানা খরচ গুণতে হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কৃষকদেরকে চরমভাবে হতাশ করেছে। জয়সিদ্ধি বড়হাটি গ্রামের কৃষক মন্নান ঠাকুর জানান, চার একর জমিতে তিনি বোরো আবাদ করেছিলেন। মহাজনের ঋণ শোধ করার জন্য ধান কাটার পর খলা থেকেই বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রতি মণ ধান মাত্র ৭০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। ‘মহাজনের ঋণ শোধ করে যে সারাটা বছর কীভাবে চলবো তা একমাত্র আল্লাহই জানে!’ বলতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন মন্নান ঠাকুর। জয়সিদ্ধি শান্তিপুর গ্রামের কৃষক জালাল মিয়া জানান, তিনি ৩ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ধানের দাম কম হলেও তাকে ঋণ পরিশোধ করতে খলাতে রেখেই ধান বিক্রি করতে হয়েছে। জয়সিদ্ধি গ্রামের কৃষক মামুনুল আলম খান জানান, কৃষিকাজ না করে এখানকার কৃষক বসে থাকতে পারে না।

তাই লাভ-লোকসানের হিসাব না করে প্রতি বছরই তারা বোরো আবাদ করেন। তিনি বলেন, দিন দিন কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে চলেছে। তাই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কৃষিকাজ করলেও তারা লাভবান হতে পারেন না। তার দাবি, কৃষকদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকদের হাত থেকে মৌসুমের শুরু থেকেই ধান ক্রয় করতে হবে।

নিকলী উপজেলার মজলিশপুর গ্রামের মামুন মিয়া (৩৫) জানান, এবার তিনি চার একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে অর্ধেক জমিতে ব্রি-ধান-৮৮ করেছিলেন। এই দুই একর জমিতে স্বাভাবিক ফলনে ধান হওয়ার কথা ছিল ১৬০ মণ। ফলন বিপর্যয়ের কারণে ধান হয়েছে ৮০ মণ। বাকি ২ একর জমিতে অন্য ধান রোপণ করে স্বাভাবিক ফলন পেলেও ঋণগ্রস্ত এই কৃষক এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। মামুন মিয়া মানবজমিনকে বলেন, ‘একদিকে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে, অন্যদিকে ধানের দাম কম থাকায় এবার আমি বড় ধরনের ধরা খেয়েছি। পাওনাদারদের তাগাদার কারণে সস্তায় সব ধান বিক্রি করে দিয়েছি। ঘরে এক ছটাক ধানও রাখিনি। সামনের দিনগুলোতে কী খেয়ে বাঁচবো এখন এই চিন্তায় আছি।’ একই গ্রামের কৃষক লোকমান হেকিম (৬০) জানান, তিনি এক একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে এক একর জমিতে ব্রি-ধান-৮৮ করেছিলেন। এই জমিতে মিশ্রণ এবং চিটার কারণে ফলন অর্ধেক হয়েছে। কৃষক লোকমান হেকিম বলেন, প্রতি মণ ধান ফলাতে আমার খরচ হয়েছে ১১০০ টাকা। এখন ৮০০ টাকার বেশি ধানের দাম উঠছে না। এ ছাড়া পাইকাররাও আসছে না। তাই ধান বিক্রি নিয়ে বিপাকে আছি। মজলিশপুর গ্রামেরই কৃষক সবুজ মিয়া (৫৫) জানান, দুই একরের কিছু বেশি জমিতে ব্রি-ধান-৮৮ চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হয়নি। অর্ধেক ধান তার কাটা হয়েছে। দেনা শোধ করার জন্য ৮০০ টাকা মণ করে তিনি কিছু ধান বিক্রি করেছেন।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন