গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতোটুকু?

গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতোটুকু?

ফন্ট সাইজ:

ডিজেলের দাম বাড়লেই বাড়ে গণপরিবহনের ভাড়া। যখন ডিজেলের দাম কমে, তখন আর কমে না ভাড়া- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ফের ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলেছেন পরিবহন মালিকরা। তবে বাসভাড়া বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যাত্রীরা। তারা বলছেন- ২০২২ সালে ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা বাড়ানোর পর গণপরিবহনের ভাড়াও বাড়ানো হয়। এরপর তেলের দাম ১৪ টাকা কমানো হলেও গণপরিবহনের ভাড়া কমানো হয়নি। এবার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ালেও পূর্বের বৃদ্ধিকৃত দামের সমানই রয়েছে। তাই এখন গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বাংলাদেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া সরকার নির্ধারণ না করলেও নন-এসি বাস-মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। অভিযোগ রয়েছে, সংস্থাটি কার্যকরভাবে নজরদারি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

২০২২ সালের ৫ই আগস্ট ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা থেকে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সে সময় শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ভিত্তিতে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ দশমিক ২০ টাকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া যথাক্রমে ২ দশমিক ৪০ টাকা ও ২ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ডিজেলের দাম কমায় ভাড়া ১৪ পয়সা কমার কথা। যদিও এ সময়ের মধ্যে দুই দফায় ৩ পয়সা ও ৫ পয়সা ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সেসময় বাসের ভাড়া কমাননি পরিবহন মালিকরা।

সর্বশেষ শনিবার ডিজেলের দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে বাস মালিকরা ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১১৪ টাকা হারে ভাড়া নিচ্ছেন অর্থাৎ লিটারে এক টাকা বেড়েছে। এই এক টাকা বাড়তির জন্য নতুন করে পরিবহনের ভাড়া বেশিহারে বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিজেলের দাম বাড়লে বাস মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বাস মালিকরা কিলোমিটার প্রতি ২২ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। যদিও সেই বৈঠকে বিআরটিএ বা সরকারের তরফে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো জানানো হয়নি।

বৈঠকে বাস মালিকরা বলেন, দূরপাল্লার একটি বাস বছরে গড়ে এক লাখ ৬৫০০ কিলোমিটার চলে। সেই হিসাবে গড়ে প্রতি কিলোমিটারে ৭৫ টাকা ৭৫ পয়সা পরিচালন ব্যয় হয়। আর শুধু প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচ হয় ৩৭ টাকা ১০ পয়সা। এর সঙ্গে বাসের আনুষঙ্গিক আরও ১৫টি আইটেম যুক্ত করার পর এবং বাসে গড়ে ৩৫ জন যাত্রী হিসাব করে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৩৪ পয়সা খরচ হয়। আর মহানগরীর বাসে গড়ে ৪০ জন হিসাব করে খরচ ২ টাকা ৪৯ পয়সা।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালিকপক্ষ সাধারণত জ্বালানির দাম বাড়লে দ্রুত ভাড়া বৃদ্ধি করলেও দাম কমলে তা সমন্বয়ে অনীহা দেখায়। এতে যাত্রীরা বঞ্চিত হন। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে ডিজেলের দাম ১৪ টাকা পর্যন্ত কমলেও তার সুফল সাধারণ যাত্রীরা পাননি। ভাড়া বাড়লেও সেবার মানের কোনো উন্নতি ঘটে না। নিম্নমানের বাস, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা এবং নির্ধারিত নিয়ম না মানার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। অথচ রুট পারমিট দেয়ার সময় বাসের মান, যাত্রীসংখ্যা ও সেবার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়া থাকে।

এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি অভিযোগ করেছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘন করে বাস ও লঞ্চের প্রভাবশালী মালিক সমিতির নেতৃত্বে একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা চলছে। সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এমন অভিযোগ তুলে বলেন, বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি সরকারের কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব বা দরকষাকষি বাদ দিয়ে একচেটিয়া ভাড়া নির্ধারণের পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

সোমবার বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ৫২ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও ৫২ আসনের কোনো বাসের ভাড়া তালিকা তৈরি করা হয় না। আরামদায়কের কথা বলে ৪০ আসনের ভাড়ার তালিকায় ৫২ আসন, ৫৫ আসন, ৬০ আসনের বাসে ভাড়া আদায় করা হয়। যা যাত্রী সাধারণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোকে অস্বাভাবিক মূল্য ও অস্বাভাবিক ব্যাংক সুদ দেখিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করে ভাড়া নির্ধারণের টেবিলে হাজির করা হয়। ফলে যাত্রী ভাড়া বেড়ে যায়। দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটার হিসেবে ভাড়া নির্ধারিত থাকলেও যাত্রী সাধারণ স্বল্প দূরত্বে গেলেও শেষ গন্তব্যের ভাড়া আদায় করা হয়। অতি সমপ্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য তিনদফা কমার প্রেক্ষিতে প্রতি ১ টাকায় ১ পয়সা হারে বাস ভাড়া কমানো হয়েছে। একই সূত্র ধরে এবার প্রতি লিটারে ১৫ টাকা মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ১৫ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ডিজেলের দাম যখন ৮০ টাকা থেকে ১১৪ টাকা হলো তখন বাস মালিকরা ভাড়া বৃদ্ধি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ডিজেলের দাম যখন ১৪ টাকা কমে ১০০ টাকা হয় তখন কিন্তু তারা ভাড়া কমাননি। এর সুফল যাত্রীরা পাননি। এখন আবার গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক মানবজমিনকে বলেন, সাধারণত মালিকরা তেলের দাম কমলে ভাড়া কমাতে চায় না, কিন্তু বাড়লে দ্রুত ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। বিআরটিএ রয়েছে জনগণের কল্যাণের জন্য কিন্তু তারা যদি চুপ করে থাকে তাহলে মালিকপক্ষ ছাড় পাবেই। বিআরটিএ জনগণের পক্ষে কাজ করছে না, যার ফলে এই নৈরাজ্য।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন