উচ্চকক্ষ, গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে টানাপোড়েন

সহযোগীদের খবর

উচ্চকক্ষ, গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে টানাপোড়েন

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো

‘উচ্চকক্ষ, গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে টানাপোড়েন’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংবিধানিক পদে নিয়োগপদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি সংসদে উচ্চকক্ষের গঠন প্রক্রিয়া ও সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি প্রশ্নেও ছিল টানাপোড়েন। এরপর সামনে আসে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে, সেই প্রশ্ন।

সংবিধান সংস্কার কমিশন উচ্চকক্ষকে ‘অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়নমূলক’ একটি স্তর হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এটি সংসদের নিম্নকক্ষের বা সংসদে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাবে, এমন চিন্তা থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের প্রস্তাব করেছিল তারা।

বিএনপিসহ প্রায় সব দলই সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার বিষয়ে একমত। বিএনপির দলীয় ৩১ দফাতেও সই করার পর জুলাই জাতীয় সনদ হাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে। ফাইল ছবি
সাধারণ বিলে উচ্চকক্ষের সম্মতির বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সংবিধান সংশোধন বিলে উচ্চকক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে। তাতে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষের দুই–তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির ভিন্নমত আছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল সংস্কার কমিশনের। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ সদস্যরা সংসদে অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবেভোট দিতে পারবেন।

এই প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি ও ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল, উচ্চকক্ষে (সিনেট) নির্বাচন হবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষে সাধারণ নির্বাচনে একটি দল সারা দেশে যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে দলটি উচ্চকক্ষে আসন পাবে।

অন্যদিকে বিএনপির চাওয়া ছিল—নিম্নকক্ষে একটি দল যতগুলো আসন পাবে, তার অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন হবে। অর্থাৎ এটি হবে এখন যেভাবে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হয়, সেটার মতো।

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হলেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, তা নয়। বরং এটি নির্ভর করবে কোন পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের নির্বাচন হবে, উচ্চকক্ষের কেমন ক্ষমতা থাকবে, সেটার ওপর। প্রস্তাবে উচ্চকক্ষকে মূলত সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়।

জুলাই সনদে বর্ণিত সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু হলে উচ্চকক্ষে কোনো দলের একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এতে উচ্চকক্ষ ভারসাম্যমূলক এবং তুলনামূলক বেশিসংখ্যক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই পদ্ধতিতে কোনো দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ারই সম্ভাবনা কম থাকে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে কোনো দলকে নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পেতে হবে। দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর কোনোটিতেই কোনো দল এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছে ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট।

পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের একটি সূত্র তখন প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজে ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তাবটি মেনে নেওয়ার জন্য বিএনপিকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপি এটি মানেনি।

উচ্চকক্ষের ক্ষমতা

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করার ক্ষমতা থাকবে না। তবে নিম্নকক্ষে পাসকৃত অর্থবিল ছাড়া সব বিল উভয় কক্ষে উপস্থাপিত হতে হবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকাতে পারবে না। উচ্চকক্ষ কোনো বিল দুই মাসের বেশি আটকে রাখলে, তা উচ্চকক্ষ দ্বারা অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।

উচ্চকক্ষ কোনো বিল পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল অনুমোদন করলে তা রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হবে।

উচ্চকক্ষ কোনো বিল প্রত্যাখ্যান করে সংশোধনের সুপারিশসহ বিল পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে পাঠাতে পারবে। নিম্নকক্ষ উচ্চকক্ষের প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। নিম্নকক্ষে পরপর দুটি অধিবেশনে পাসকৃত বিল যদি উচ্চকক্ষ প্রত্যাখ্যান করে এবং নিম্নকক্ষ যদি এটি আবারও পরবর্তী অধিবেশনে পাস করে, তবে উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো যাবে।

সাধারণ বিলে উচ্চকক্ষের সম্মতির বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সংবিধান সংশোধন বিলে উচ্চকক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে। তাতে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষের দুই–তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) আছে। তারা উচ্চকক্ষে সংবিধান সংশোধন বিল পাঠানো এবং তা পাস করানোর বিপক্ষে।

বিএনপি যেভাবে উচ্চকক্ষ চায়, তাতে নিম্নকক্ষে কারও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে উচ্চকক্ষেও তা থাকবে। এতে উভয় কক্ষেই ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে যাবে, যা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেবে।

গত বছরের ২৯ জুন ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এই মতপার্থক্য উঠে আসে। সেদিন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছিলেন, যদি নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে এটি নিম্নকক্ষের ‘রেপ্লিকা’ হবে। একই দিন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছিলেন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা না থাকলে সেটার প্রয়োজনীয়তা থাকে না।

দ্বিকক্ষের প্রস্তাব কেন

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে একটি এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আসছে। নির্বাহী কার্যাবলির দুর্বল তদারকি, প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং বিভিন্ন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সংসদ যথাযথ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। নির্বাহী বিভাগের আধিপত্যের কারণে অর্থপূর্ণ সংসদীয় আলোচনা এবং সংসদের যাচাই-বাছাই কার্যক্রম লক্ষণীয়ভাবে সীমিত হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির কারণে জবাবদিহির জায়গাটা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

তাতে আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত পর্যালোচনা এবং কার্যকর বিতর্ক ছাড়াই দ্রুত ও দুর্বল আইন প্রণয়নের কারণেও এক কক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থা সমালোচিত হয়েছে। সংসদীয় তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণের অভাবে শাসক দলকে নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা স্বেচ্ছাচারী আইন প্রণয়ন ও ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণে সহায়তা করেছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী ও পঞ্চদশ সংশোধনীর উদাহরণ টানা হয়। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় শাসনপদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনপদ্ধতি চালু এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। আর ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছিল।

এসব বিবেচনা করে কমিশন এককক্ষীয় আইনসভার কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো মোকাবিলার জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করে।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কতটা কমবে

দেশে সংসদীয় ব্যবস্থায় এখনো ব্যক্তি একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও ক্ষমতাসীন দলের প্রধান হতে বাধা নেই। অনেকে মনে করেন, এতে সরকার, সংসদ ও দলে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ একজনের হাতে থাকে। এখানে পরিবর্তন আনতে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না।

দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, একই ব্যক্তি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদে থাকতে পারবেন না। এ বিষয়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দল একমত হয়। তবে এই সিদ্ধান্তে বিএনপিসহ কয়েকটি দল ভিন্নমত দিয়েছে। বিএনপি বলেছে, একটি দল নির্বাচনে জয়ী হলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন আর কে দলীয় প্রধান হবেন, গণতান্ত্রিকভাবে এটা ঠিক করার এখতিয়ার ওই দলের। এটি সংবিধানের বিষয় নয়।

যেভাবে সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, তাতে কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমবে। যেমন নির্বাচন কমিশন গঠন। সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটি বাছাই কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার বাছাই করবে। কমিটি যাঁদের বাছাই করবে, তাঁদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমবে।

আর এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে বিএনপি এই প্রস্তাব এনেছিল, তাতে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির একটি শর্ত ছিল, তা হলো তারা ১০ বছরের বিষয়টি মানবে, সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদে নিয়োগের পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় কিছু পরিবর্তন আসবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের’ পরিবর্তে ‘মন্ত্রিসভার অনুমোদনের’ বিধান যুক্ত করা হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা–সম্পর্কিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তাঁর অনুপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় উপনেতার উপস্থিতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ প্রস্তাবেও বিএনপিসহ প্রায় সব দল একমত।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব আছে সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে। কিন্তু এসব প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আছে।

অবশ্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ ভিন্নমত জানিয়ে প্রথম আলোতে বিশ্লেষণ লিখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রধানমন্ত্রীর পদকে গুরুত্বহীন করে তোলা হচ্ছে। তাঁর যুক্তিগুলো আমার এ লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম।

নিজাম উদ্দিন আহমদের লেখার প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোতে ২৮ মার্চ বিশ্লেষণ লিখেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওই লেখায় নিজাম উদ্দিন আহমদের যুক্তিগুলো খণ্ডনের পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য কেন প্রয়োজন এবং সেটি কীভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করেন ইমরান। তিনি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো ব্যাখ্যা করে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে এমন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, যা প্রধানমন্ত্রীকে গুরুত্বহীন করে ফেলে।

ইমরান আরও লেখেন, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের গঠন হবে: তিনজন সরকারি দল থেকে, তিনজন বিরোধী দল থেকে এবং তিনজন নিরপেক্ষ সদস্য—রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি এবং এমন একজন সংসদ সদস্য, যিনি সরকার বা প্রধান বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্ত নন। এই ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো নিশ্চিত করবে যে কোনো একক গোষ্ঠী পুরো কাউন্সিলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

ইমরানের ভাষ্য ছিল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের প্রতিনিধিদের এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার ফলে এটি কম গণতান্ত্রিক নয়, বরং অধিকতর গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো সব সময় এই নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কিন্তু ঠিক এ কারণেই জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের প্রয়োজন; নিয়োগপ্রক্রিয়া ন্যায়সংগত রাখা এবং তা যেন কোনো একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটা বাড়বে

সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। এই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং কার্যকরী ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান; ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের মহাপরিচালকসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, গভর্নর, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।

তবে এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপিসহ ছয়টি দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়।

সংসদে জবাবদিহি

ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে বিএনপির ভিন্নমত আছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল সংস্কার কমিশনের। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ সদস্যরা সংসদে অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

অবশ্য এখানে বিএনপি আরও দুটি বিষয় যুক্ত করার বিষয়ে বলেছিল— সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি)। অর্থাৎ বিএনপির অবস্থান হলো—সংসদে সদস্যরা অর্থবিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন বিল ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে নিজ দলের বাইরে ভোট দিতে পারবেন না।

নারী প্রতিনিধিত্ব

সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ১০০টিতে উন্নীত করা এবং সেখানে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা করার।

নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় সব দল সমর্থন করলেও নারী আসনে নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য ছিল। শেষ পর্যন্ত নারী আসনে সরাসরি ভোটের বিষয়ে একমত হতে পারেনি দলগুলো।

সিদ্ধান্ত হয়েছিল, জুলাই সনদ স্বাক্ষর–পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে (ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন) ৩০০ আসনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, তবে এটি সংবিধানে উল্লেখ থাকবে না। এতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি ছাড়া সব দল একমত হয়। অবশ্য কোনো দলই গত নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। বিএনপির মোট নারী প্রার্থী ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর বর্তমান প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি।

নারী আসনের বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত হয়—বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল রেখে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে দলগুলো সাধারণ ৩০০ আসনে ন্যূনতম ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। এভাবে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ বর্ধিত হারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন অব্যাহত রাখা হবে।

তবে বাংলাদেশ জাসদ, সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ও বাসদ নারী আসন ১০০টি করা এবং সরাসরি ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা

নির্বাচনকালীন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে রাখার প্রস্তাব ছিল সংস্কার কমিশনের। এই ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে সব দল একমত হয়। এই সরকারের গঠনপদ্ধতি নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল ঐকমত্য কমিশনে। শেষ পর্যন্ত জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়ার১৫টি স্তরের কথা বলা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি স্তর নিয়ে বিএনপিসহ ৭টি দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে। একটি স্তর নিয়ে জামায়াতেরও নোট অব ডিসেন্ট আছে।

ছিল সংশয়ও

সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কতটা ঐক্য হবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল। বিশেষ করে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি প্রশ্নে আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।

যেমন ২৯ জুন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছিলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম আবু সাঈদের শাহাদাতবার্ষিকীতে (১৬ জুলাই, ২০২৫) সবাই মিলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করব। কিন্তু বাস্তবে সেটা কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। এ বিষয়ে আমাদের এখন খানিকটা শঙ্কাও রয়েছে।’

সেদিন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনও মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর কতটা ঐকমত্য হবে, সে ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যে বিষয়গুলো মৌলিক সংষ্কারের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, সেগুলোতে বিএনপি বা তার সঙ্গে আরও কয়েকটি দল দ্বিমত পোষণ করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনার পরও সে বিষয়টা অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। এটা একটা আশঙ্কার জায়গা তৈরি করছে।

এর আগে একদিন আলোচনা শেষে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এখানে কিছু কিছু দল একবারে নিজেদের অবস্থানে অনড়। যদি এভাবে চলতে থাকে, কিয়ামত পর্যন্ত কোনো ঐক্যের সম্ভাবনা দেখি না।’

২৯ জুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হবে, সেগুলো নিয়ে জাতীয় সনদ সই হওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘এখানে যদি আমাদের বাধ্য করা হয় যে এই সমস্ত বিষয়ে একমত হতেই হবে, সেটা তো সঠিক হলো না।’

সংশয় থেকে প্রাথমিক সাফল্য

যখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়, তখন যে প্রশ্নটি বড় আকারে সামনে এসেছিল তা হলো বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ঐকমত্য তৈরি করা কি আদৌ সম্ভব? আমার নিজেরও এটি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল। বিষয়টি নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের কারও কারও মধ্যেও শুরুতে এই সংশয় আমি দেখেছি। বিশেষ করে একটি বড় দলের সঙ্গে প্রথম পর্বের প্রথম রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর তাঁদের কেউ কেউ হতাশ হয়েছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত ৩০টি রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন সংস্কার প্রশ্নে আলোচনা চালিয়ে গেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। একটি সনদও তারা তৈরি করতে পেরেছে। সেদিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।

প্রাথমিকভাবে এই আলোচনা সফল হওয়ার পেছনে মোটাদাগে তিনটি কারণ কাজ করেছে বলে মনে হয়। প্রথমত, একটি গণ–অভ্যুত্থানের পরপরই এই আলোচনাটা শুরু হয়েছিল, সংস্কার বা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তখন একেবারে তাজা।

দ্বিতীয়ত, এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার দলগুলো মতাদর্শিক দিক থেকে ডান, বাম বা মধ্যপন্থার হলেও সবাই ছিল অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি। এই আলোচনায় আওয়ামী লীগ বা তার রাজনৈতিক মিত্র দলগুলো ছিল না।

তৃতীয়ত, দ্বিতীয় পর্বের মূল আলোচনা বা বৈঠকগুলো টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি যতটুকু জেনেছি, প্রথম পর্বের আলোচনার অভিজ্ঞতা থেকে এটা সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সংস্কার প্রশ্নে দলগুলোর কার কী অবস্থান, তা যেন মানুষ দেখতে পায়।

শেষ পর্যন্ত সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরির লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা শেষ হয় গত বছরের ৩১ জুলাই। এরপর জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু হয় তৃতীয় পর্বের আলোচনা। তবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ঠিক হওয়ার আগেই জুলাই সনদ সইয়ের আয়োজন করা হয়।

১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি, জামায়াতসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল এই সনদে সই করে। এনসিপিসহ ছয়টি দল সেদিন সনদে সই করেনি। পরে অবশ্য এনসিপি ও গণফোরাম সনদে সই করে।

ভিন্নমত থাকবে কি না

জুলাই সনদে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল। জামায়াত, এনসিপিসহ বেশ কিছু দলের অবস্থান ছিল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রাখা যাবে না। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকও নোট অব ডিসেন্ট রাখার বিপক্ষে ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের যুক্তি ছিল—নোট অব ডিসেন্ট সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে না। এটা শুধুই ভিন্নমত।

অন্যদিকে কেউ কেউ বলেছিলেন, শুধু যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো নিয়ে সনদ করা প্রয়োজন। যেমন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানের অভিমত ছিল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত করে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা উচিত নয়; বরং যেসব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য রয়েছে, কেবল সেগুলো নিয়েই জুলাই সনদ চূড়ান্ত হওয়া উচিত। (প্রথম আলো, ৩ আগস্ট ২০২৫)

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও শুরুতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ না রাখার বিষয় বিবেচনা করেছিল। সেভাবেই জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া দলগুলোর কাছে প্রথমে পাঠানো হয়েছিল। পরে শুধু কোন প্রস্তাবে কার ভিন্নমত আছে, সেটা উল্লেখ করার চিন্তা ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিএনপির দাবি ছিল ভিন্নমতের উল্লেখের পাশাপাশি যেন একটা নোট দেওয়া হয়, সেটা এ রকম—‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেইমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’

ঐকমত্য কমিশনের একটি সূত্র তখন প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, এ ধরনের নোট রাখার বিষয়ে কমিশন একমত ছিল না। কিন্তু জুলাই সনদ সই হওয়ার আগমুহূর্তে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় বিএনপি। এটি রাখা না হলে বিএনপি সনদে সই করবে না—এমন একটা আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষর অনুষ্ঠান যাতে ভেস্তে না যায়, সে জন্য সনদে এটি যুক্ত করা হয়।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে তৃতীয় পর্ব

৩১ জুলাই দ্বিতীয় পর্বের আলোচনার শেষ দিন এনসিপি, জামায়াতসহ কয়েকটি দলের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনার দাবি তোলা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের টার্মস অ্যান্ড রেফারেন্স অনুযায়ী সনদ বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ করার এখতিয়ার তাদের নেই। তারপরও যদি এটি নিয়ে কমিশন আলোচনা করতে চায়, বিএনপি তাতে অংশ নেবে।

পরে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবারও আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেছিল ঐকমত্য কমিশন। পাশাপাশি একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গেও কমিশন অনেকগুলো বৈঠক করেছিল।

শুরুতে সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—এই তিন দলের তিন ধরনের অবস্থান দেখেছি। সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো সংসদ গঠনের পরবর্তী দুই বছরে সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পক্ষে ছিল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী চেয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বা গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হোক। আর এনসিপি চেয়েছিল গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হোক। বাস্তবায়নের উপায় নিয়েও দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিল। এ পর্বে গণভোট করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে বিএনপি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট চেয়েছিল। আর জামায়াত, এনসিপিসহ কিছু দল চেয়েছিল এটি আগে করা হোক। একই সঙ্গে তারা একটি বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারির দাবিতে অনড় থাকে। আর বিএনপি বলে আসছিল, সাংবিধানিক আদেশ জারির কোনো এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। একটি প্রজ্ঞাপন হতে পারে। এর ভিত্তিতে একটি অধ্যাদেশ করে গণভোট করা যায়।

ঐকমত্য কমিশন বলেছিল, সনদ বাস্তবায়নের উপায় জুলাই সনদের অংশ হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে তারা একাধিক সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারকে দেবে। পরে ২৮ অক্টোবর তারা সরকারের কাছে কাছাকাছি দুটি বিকল্প প্রস্তাব সুপারিশ করে।

সেখানে সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রথমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি, এরপর গণভোট এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়। সংসদ নির্বাচনে জয়ীরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কারকাজ শেষ করবে পরিষদ। বিকল্প একটি প্রস্তাবে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এটি না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব প্রস্তাব পাস হয়ে যাবে। তবে কমিশনের সুপারিশ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

বাস্তবায়নের উপায়, আদেশ জারি

গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশটি বাদ দেওয়া হয়। অন্যদিকে জানানো হয়, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

সেখানে জুলাই সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট করার কথা বলা হয়। গণভোটের প্রশ্নও ঠিক করে দেওয়া হয় আদেশে। এতে যেভাবে প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করা হয়, তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের মতো বিষয়গুলোতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে জুলাই জাতীয় সনদে যেসব প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ আদেশ জারি করা নিয়েও রাজনৈতিক মতভিন্নতা ছিল। শুরু থেকেই বিএনপি বলে আসছিল, এ ধরনের আদেশ জারির এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। তবে তারা একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট করার বিষয়টিকে সমর্থন করে।

আদেশ জারির পর বিএনপি এই আদেশের বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া জানালেও পরে তারা বিষয়টি নিয়ে সেভাবে আর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল তারা এটা মেনে নিয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্যও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আহ্বান জানান।

তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ওই আদেশের বিপক্ষে বিএনপি আবার নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। তারা জাতীয় সংসদে এই আদেশটিকে ‘অবৈধ’ এবং ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার একটি দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং এই আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেবে না বলে পরিষ্কার করেছে। গণভোট অধ্যাদেশও সংসদে অনুমোদন করা হয়নি। বিএনপি বলছে, ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটা তারা অক্ষরে অক্ষরে মানবে।

গণভোট কেন হয়েছিল

গণভোট হয়েছে মূলত দুটি বিষয়ের অনুমোদনের জন্য। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ৩ নম্বর ধারায় গণভোট সম্পর্কে বলা আছে, ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে এই আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থান করা হইবে।’

ওই আদেশের ৪ নম্বর ধারায় গণভোটের ব্যালটে উত্থাপনীয় প্রশ্ন সম্পর্কে বলা ছিল। তাতে বলা হয়, গণভোটে নিম্নরূপ প্রশ্ন উপস্থান করা হবে—‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধানের সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ (হ্যাঁ/না):

(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।

(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধনী করিতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।

(গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হইয়াছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকিবে।

(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।

গণভোটের প্রশ্ন অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি ও ক্ষমতা, সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি—মৌলিক সংস্কারের এ বিষয়গুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের গুরুত্ব নেই। গণভোটে এগুলো পাস হয়েছে জুলাই সনদে মূল প্রস্তাব যেভাবে আছে সেভাবে। বিএনপি বা অন্য দলের নোট অব ডিসেন্ট গণভোটে আসেনি।

ফলে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে রায় এসেছে।

ভোটের আগে আগে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছিলাম, তাদের একটা আশঙ্কা ছিল যে বিএনপি গণভোটে গোপনে ‘না’–এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারে। এটি হলে ভোটে না জয়ী হয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে চেষ্টা ছিল বিএনপি যেন ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে প্রচার চালায়।

গত ৩০ জানুয়ারি রংপুরে নির্বাচনী জনসভায় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই সনদের সম্মানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সেদিন তারেক রহমান বলেন, ‘সেখানে আমাদের সংস্কার প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। মোটামুটিভাবে সংস্কার প্রস্তাব যেগুলো আমরা দিয়েছি, যা আমরা জনগণের সামনে অনেক আগে উপস্থাপন করেছিলাম, সেটাই কমবেশিভাবে তারাও দিয়েছে। হতে পারে কোনো কোনোটির ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কিছু কিছু দ্বিমত আছে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যদি দ্বিমত থাকে, আমরা লুকোছাপা করিনি। আমরা জনগণের সামনে প্রকাশ্যে বলেছি, কোনটিতে আমরা সম্মতি দিয়েছি, কোনটিতে আমাদের অসম্মতি আছে।’

তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জুলাই জাতীয় সনদ আদেশ এবং গণভোটের রায় কার্যকর করার বিপক্ষে অবস্থান নেয় বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ত্রয়োদশ সংসদে একাধিক দিন বলেছেন, ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ যাত্রা শুরু করার পর থেকে রাষ্ট্রপতির আর কোনো আদেশ জারির এখতিয়ার নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ।

ওই আদেশের ভিত্তিতে জারি করা গণভোট অধ্যাদেশও সংসদে অনুমোদন করা হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, গণভোট দেওয়া হয়েছে গোঁজামিল করে। প্রশ্ন চারটি হলেও উত্তর দেওয়ার অপশন ছিল একটি।

তবে বিএনপি বলছে, তারা ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ যেভাবে সই করেছে সেভাবে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন করবে। ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অর্থ হলো সংবিধানে মৌলিক যেসব সংস্কার আনার প্রস্তাব ছিল, সেগুলো আসবে না। বিএনপির দলীয় ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে সংবিধান সংশোধন হবে।

ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অর্থ হলো সংবিধানে মৌলিক যেসব সংস্কার আনার প্রস্তাব ছিল, সেগুলো আসবে না। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ করা বা যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ, পর্যাপ্ত ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্যের কথা সংস্কার কমিশন বলেছিল, সেটা কতটা পূরণ হবে, সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আবার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া শুধু আইন–বিধির পরিবর্তনের মাধ্যমে এ ধরনের সংস্কার কতটা সম্ভব, সে প্রশ্নও থেকে যায়। (শেষ)

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ফের তৎপর’। খবরে বলা হয়, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ফের তৎপর হয়ে উঠেছে। বিদেশে বসেই নাড়ছে কলকাঠি। যখন যাকে দরকার দিচ্ছে ফোন, চাইছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। কখনো দেশে থাকা সহযোগী সরাসরি গিয়ে ফোন ধরিয়ে দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে ‘বড় ভাই’ কথা বলবেন। অগত্যা পিলে চমাকানো হুমকি। দিতে হবে মোটা অঙ্কের চাঁদা, না দিলে খবর আছে। টাকা দিতে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে দিনক্ষণ। রাজি না হলে বলা হচ্ছে, ‘চাঁদা না দিলে জীবন দিবি। যে কোনো একটা দিতেই হবে।’ ভুক্তভোগীদের অনেকে ভয়ে পুলিশ তো দূরের কথা, কোথাও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে এ রকম শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীদের শিকার হয়েছেন ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেকে।

শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের চাঁদাবাজিতেই শেষ নয়, রাজধানীর এলাকা ধরে ধরে বাজার ও ফুটপাত থেকে দৈনিক লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও তারা কম যান না। এছাড়া বড় অঙ্কের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, দরকার হলে টাকার বিনিময়ে কারও বাড়ি দখলও তাদের জন্য যেন মামুলি ব্যাপার। এভাবে দেশ থেকেই কোটি কোটি টাকার চাঁদার ভাগ যাচ্ছে হুন্ডি হয়ে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে। চাঁদার টাকায় সেখানে তাদের বিলাসী জীবন আরও নির্বিঘ্ন হচ্ছে। এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর কেউ আবার সহসা দেশে ফিরে আসবেন বলে দেশে থাকা সহযোগীরা প্রচার করছে সগৌরবে। ফলে চাঁদার পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। রাজধানীর ২০টি এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অর্ধশতাধিক সহযোগী।

এদিকে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর অপতৎপরতায় অস্থির হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে খুনি-সন্ত্রাসীরা। চাঁদার দাবিতে করছে গোলাগুলি। টেন্ডার দখলকে কেন্দ্র করে সোমবার বিকালে ক্যানসার হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেনকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনাও ঘটেছে। এসবের নেপথ্যে রয়েছে জামিনে বেরিয়ে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তাদের নেতৃত্বাধীন চক্রের সদস্যরা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। এসব ঘটনায় মাঝেমধ্যে খুনের মতো ঘটনা ঘটে। এই অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দফায় দফায় বৈঠক করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিট। সমন্বয় সভা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও। মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিন পাওয়া সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছে। অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে ফেরার। কেউ কেউ কারাগারে বসেই নির্দেশনা দিচ্ছে দেশকে অস্থিতিশীল করার। জামিনপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীদর মধ্যে সরকারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী আছে অন্তত ছয়জন। জামিনে বেরিয়ে এসে যারা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। ইতোমধ্যে এসব সন্ত্রাসীর আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নাম উঠে এসেছে পিচ্চি হেলালের। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, এলিফ্যান্ট রোডসহ আশপাশের এলাকার অপরাধজগতে পিচ্চি হেলালের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইমন। এলিফ্যান্ট রোডের বিপনিবিতান মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় ইমনের লোকজন জড়িত বলে জানা গেছে। জামিন পওয়ার পর ইমন থাইল্যান্ড চলে গেলেও তার অপতৎপরতা থেমে নেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন। দুই-একজন কারাগারে আছেন। বাকিরা বিদেশে অবস্থান করে দেশের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে গত ২৫ বছরে আলোচিত অনেক সন্ত্রাসীর উত্থান হলেও সরকারের পক্ষ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়নি। এই মুহূর্তে মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক ও কাফরুল এলাকায় অন্তত চার শীর্ষ সন্ত্রাসীর তৎপরতা রয়েছে। তারা হলেন মফিজুর রহমান মামুন, শাহাদাত হোসেন ওরফে সাধু, কিলার আব্বাস ও ইব্রাহিম খলিল ওরফে কিলার ইব্রাহিম। এরা সবাই দেশের বাইরে অবস্থান করছে এবং মাঝেমধ্যে বিদেশ থেকে মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তাদের হয়ে কাজ করছেন স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। এদের মধ্যে মামুনের বিরুদ্ধে অন্তত ২৭টি মামলা রয়েছে। আব্বাস অন্তত এক ডজন মামলার আসামি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন কিলার আব্বাস।

বিদেশে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে গত ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় কাফরুলে একেএম অ্যাপারেলস গার্মেন্ট কারখানায় প্রবেশ করে ১২ থেকে ১৩ জন সন্ত্রাসী। তারা প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় পিস্তল বের করে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। পরে অফিসের লকার ভাঙচুর করে। তিন দিনের মধ্যে চাঁদা না দিলে কারখানা মালিককে হত্যার হুমকি দেয়। সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার সময় সিসি ক্যামেরার ডিভিআর ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় এরই মধ্যে স্থানীয় চার সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমসংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন র‌্যাব-৪ এর মিডিয়া অফিসার কেএন রায় নিয়তি। তিনি জানান, গ্রেফতারকৃতরা সন্ত্রাসী বাহিনী ‘ফোর স্টার’ গ্রুপের সদস্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় গত জানুয়ারিতে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির। ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী গত বছরের সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থকে মুক্তি পান। জামিন পাওয়ার ১২ দিনের মধ্যেই তিনি দুবাই হয়ে চলে যান সুইডেনে। সেখানে বসেই তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অপরাধ জগত। তার বিরুদ্ধে ২২টি মামলা ছিল। যার মধ্যে হত্যা মামলা ৯টি। বেশ কয়েকটি মামলায় সাজাও হয় তার। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় ১৭ বছরের জেলও হয়। সূত্র বলছে, সর্বশেষ এই সন্ত্রাসীর নামে আর কোনো মামলা বিচারাধীন আছে কি-না তা পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে আতঙ্কের খবর হলো-সন্ত্রাসীদের গডফাদার হিসাবে পরিচিত ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির পেশার টার্গেটকৃত লোকজনকে এমন তথ্য দিয়ে হুমকিও দিচ্ছে তার অনুসারীরা। এতে রাজধানীর ফার্মগেট, ইন্দিরারোড, কাওরানবাজার, তেজগাঁও, শেরেবাংলানগর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাতিরঝিল ও শিল্পাঞ্চল এলাকায় জনমনে ভীতি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

কালের কণ্ঠ

জন্ম নিয়ন্ত্রণে ‘লাল বাতি’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, পরিবার পরিকল্পনায় গর্ব করার মতো ঈর্ষণীয় জাতীয় সাফল্য এখন ম্লান হওয়ার পথে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অবহেলা, অমনোযোগ ও গাছাড়া ভাবে পুরো জন্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তথা পরিবার পরিকল্পনায় ‘লাল বাতি’র দশা। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল কিংবা কনডমসহ বিভিন্ন উপকরণের স্টক প্রায় ফুরিয়ে এখন তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে এসে ঠেকেছে। খোদ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের (এসসিএমপি) মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে দেশের প্রতিটি উপজেলায় এসব উপকরণের স্থলে ‘লাল চিহ্ন’ দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে; যার অর্থ, মাঠ পর্যায়ে প্রায় সব উপজেলায় কনডম, বড়ি, ইমপ্লান্ট, আইইউডির মজুদ প্রায় শূন্যের কোঠায়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (উপকরণ ও সরবরাহ) মো. আবদুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে ‘লাল’ হয়ে থাকার অর্থ হলো মজুদ নেই বা মজুদ তিন মাসের কম। আর ‘হলুদ’ সংকেত নির্দেশ করে মজুদ তিন থেকে সাড়ে পাঁচ মাস পর্যন্ত রয়েছে। ছয় মাসের বেশি মজুদ থাকলে সংকেত হবে ‘সবুজ’।

তিনি জানান, কবে থেকে এই সংকট চলছে সেটিও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালে দেখা যায়। এই কর্মকর্তার কথা মতো কনসাম্পশন ট্রেন্ড বা সরবরাহের অবস্থা দেখতে এসসিএমপির মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে গিয়ে দেখা যায়, দেড় বছর ধরে এই সংকট তীব্র হয়েছে, যা অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অর্জিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সাফল্য হারাতে বসেছে। অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও নিরাপদ মাতৃত্ব ব্যাহত হতে পারে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় কনডম নেই ৩৯৪ উপজেলায়। ৩৩৭ উপজেলায় নেই কোনো ওরাল পিল। ইমার্জেন্সি পিল (ইসিপি) অনুপস্থিত ৪৬৮ উপজেলায়, তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য গর্ভনিরোধ সুরক্ষায় ব্যবহৃত ইমপ্লান্ট নেই ৩৫৮ উপজেলায়। ১০ বছরের জন্য কার্যকর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি আইইউডি শেষ হয়েছে ৩৯২ উপজেলায়। এ ছাড়া ইনজেকশনের মজুদ ফুরিয়েছে ২৭১ উপজেলায়। শুধু জন্ম নিয়ন্ত্রণ নয়, মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি উপকরণ মিসোপ্রোস্টল, অক্সিটোসিন, আয়রন-ফলিক এসিড, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট—এসবও প্রায় সব উপজেলায় মজুদশূন্য।

গত ২০ এপ্রিল রাত পর্যন্ত এসসিএমপির মনিটরিং ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কনডম রয়েছে ১৭ লাখ ৯৫ হাজার, যা সর্বোচ্চ ৩৬ দিনের মজুদ। ওরাল পিল বা বড়ি আছে ২৯ লাখ ৬৩ হাজার, যা সর্বোচ্চ ৪০ দিন চলতে পারে। আইইডি মজুদ রয়েছে ১৬ হাজার, যা দিয়ে দুই মাস চলা যাবে। ইনজেকশন রয়েছে ১০ লাখ ১৩ হাজার, যা মাত্র দুই মাসের মজুদ। ইমপ্লান্টের মজুদ শূন্য।

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘চালের দামে উল্টো পথে বাংলাদেশ’। খবরে বলা হয়, এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে চালের দাম মানভেদে প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও দেশের বাজারে উল্টো বেড়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত। একইভাবে পাম অয়েল, মসুর ডাল, রসুনসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশে তা বেশি রয়েছে। সরকারের দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্সের বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় বিশ্ববাজারে দাম কমলেও ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে বাজার মনিটরিং জোরদার এবং উৎপাদন খরচ কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছর আগে বিশ্ববাজারে ৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের দাম ছিল প্রতি টন ৫২৯ ডলার, যা গত ১৯ এপ্রিল কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩৩ ডলারে। কমেছে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। একইভাবে ১৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের দাম ৫২০ ডলার থেকে নেমে ৪২৩ ডলারে এসেছে। কমেছে ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ ।

কিন্তু দেশের বাজারে মোটা চাল (স্বর্ণা) উল্টো বেড়েছে। এক বছর আগে এ চালের দাম ছিল ৫২ থেকে ৫৭ টাকা, যা ১৯ এপ্রিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ । পাশাপাশি মাঝারি মানের (পাইজাম) চালের দামও এক বছরে প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার সুফল না পাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো উচ্চস্থানীয় উৎপাদন ব্যয়, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত প্রতিযোগিতা। তাঁর মতে, দেশের চাহিদার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে পূরণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক দামের প্রভাব সরাসরি পড়ে না। পাশাপাশি আমদানিকারকদের একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারের কম দামের সুবিধা ভোক্তাদের না দিয়ে স্থানীয় বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশি মুনাফা করে।

তিনি আরও বলেন, আমদানিতে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকায় এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যা বাজারে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে তিনি আমদানি প্রক্রিয়া উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করা, সময়মতো আমদানি নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।

আরও কয়েকটি পণ্যের চিত্র

বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের দাম এক বছরে প্রায় ১২ শতাংশ কমলেও দেশে বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সয়াবিন তেলের দাম বিশ্ববাজারে প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। দেশে বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। মসুর ডালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও দেশে তার প্রতিফলন নেই। রসুনের দাম বিশ্ববাজারে ৩২ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশে দেশীয় রসুনের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে আমদানি করা রসুনের দাম দেশে এক বছরে ৯ শতাংশ কমেছে। এদিকে আদার দাম বিশ্ববাজারে মাত্র ৭ শতাংশ বাড়লেও দেশে তা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত।

টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণ

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। তবে দাম কমলে দেশের বাজারে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয় না। স্থানীয় উৎপাদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন স্বাভাবিক। আমদানি ও এলসি বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ পণ্যের আমদানি সামান্য কমলেও ঈদুল আজহা উপলক্ষে মসলা জাতীয় পণ্যের আমদানি কিছুটা বেড়েছে। আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল।

মাসিক ভিত্তিতে রসুন, আদা ও দারুচিনির দাম বেড়েছে । বার্ষিক ভিত্তিতে চাল, তেল, দেশীয় রসুন, জিরা ও লবঙ্গের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চাহিদার তুলনায় কিছু পণ্যের আমদানি কম থাকলেও বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, এসব পণ্যের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বিদ্যমান।

ইত্তেফাক

‘গ্রামে ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশ জুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিং পরিস্থিতিতে। এপ্রিলের শুরু থেকেই লোডশেডিং নতুন মাত্রা পেয়েছে, যা মে-জুনে আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৫৮ মেগাওয়াট। একই দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং পৌঁছায় ১ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াটে। গত কয়েক দিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে গত রবি, সোম ও মঙ্গলবারে যথাক্রমে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬.৩, ৩৬.৬ এবং ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) ও বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, তিন দিনই বিদ্যুতের লোডশেড ১৯০০ মেগাওয়াটের মতো ছিল। বিদ্যুতের পরিমাণ বিবেচনায় এ সময়ে ঢাকা অঞ্চলে লোডশেড বেশি হলেও সময় বিবেচনায় তা ছিল অপেক্ষাকৃত কম। আর বিদ্যুত্ না থাকার সময় বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি লোডশেড হয় বরিশাল অঞ্চলে, দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। এরপর বেশি সময় অন্ধকারে থাকা অঞ্চলগুলো হলো যথাক্রমে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা বিভাগ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং রংপুর। তবে ঢাকা শহরে লোডশেডিং অপেক্ষাকৃত কম, দৈনিক ১ থেকে ২ ঘণ্টা। এমনকি অনেক এলাকায় লোডশেড প্রায় শূন্য।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং একাধিক এলাকায় তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে আবাসিক খাতে ফ্যান, এসি ও কুলিং ডিভাইসের ব্যবহার বেড়েছে। কৃষিতে বোরো সেচের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প খাতেও বৈদ্যুতিক জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাত্ লাফিয়ে বাড়লেও উত্পাদন সেই হারে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলেই লোডশেডিং বাড়ছে।

উত্পাদন, চাহিদা ও সরবরাহে বাড়ছে ব্যবধান

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাবস্টেশন পর্যায়ে বিদ্যুতের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু প্রকৃত উত্পাদন ১৩-১৪ হাজার মেগাওয়াট। এখানেই ঘাটতি প্রায় ১-২ হাজার মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে এই ঘাটতি আরো বেশি। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা আরো বেশি। তাই বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ও লোডশেড সরকারি তথ্যের চেয়ে বেশি বলে জানান খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। সোমবার ইভিনিং পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে উত্পাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১৯৮ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ৯১২ মেগাওয়াট। অন্যদিকে দিনের বিভিন্ন সময়ে ৯১৩ থেকে ১৮৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।

অঞ্চলভেদে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য চিত্র

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। আবার ঘাটতিও বেশি এ বিভাগে। তবে যে পরিমাণ বিদ্যুতের ঘাটতি থাকে তাতে ঢাকায় লোডশেড হয় গড়ে ২ ঘণ্টার মতো। কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে চাহিদা অপেক্ষাকৃত কম থাকলেও সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কম। ফলে ঐ অঞ্চলগুলোতে জনগণ দীর্ঘসময় বিদ্যুেসবা বঞ্চিত থাকেন। পিজিসিবির ও পিডিবির সাব স্টেশন পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে এবং স্থানীয় সূত্রগুলো মতে, বরিশাল অঞ্চলে বর্তমানে বিদ্যুত্ সরবরাহ চাহিদার চেয়ে সবচেয়ে কম। দিনে ৮-১০ বার বিদ্যুত্ গিয়ে ১০-১২ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে ভোগেন মানুষ। কিছু এলাকায় সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও কম।

রাজশাহী অঞ্চলে দিনে ছয় থেকে আট বার বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়। এতে ৮-১২ ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে না। কৃষি সেচ ও রাতের পিক লোডের সময়ও একাধিকবার বিদ্যুত্ সরবরাহ পাওয়া যায় না। খুলনা অঞ্চলে দিনে ছয় থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে না। বিদ্যুত্ চলে যায় পাঁচ থেকে আট বার। এর ফলে ঐ অঞ্চলের শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হয়। চট্টগ্রাম শহরে বিদ্যুত্ সরবরাহ অপেক্ষাকৃত ভালো থাকলেও এ বিভাগের গ্রামীণ এলাকায় এবং উপজেলা শহরগুলোতেও দিনে ছয় থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুত্ সরবরাহ থাকে না। কিছু এলাকায় ১৬-১৭ ঘণ্টাও বিদ্যুত্ থাকে না। দিনে বিদ্যুত্ যায় ছয় থেকে ১০ বার।

ঢাকা বিভাগে শহরাঞ্চলের বাইরে গ্রামে ও উপজেলা পর্যায়ে দিনে পাঁচ-সাত বার বিদ্যুত্ গিয়ে লোডশেড হয় ছয় থেকে আট ঘণ্টা। কুমিল্লা অঞ্চলেও দিনে ছয় থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সরবরাহ পায় না জনগণ। সেখানেও শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেড ও ভোগান্তি বেশি। ময়মনসিংহে পাঁচ-সাত বার বিদ্যুত্ গিয়ে পাঁচ-আট ঘণ্টা বিদ্যুতের সরবরাহ থাকে না। সিলেটে দিনে গড়ে চার-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে না। কিন্তু কিছু উপজেলায় বা এলাকায় দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুত্ থাকে না। রংপুরে দিনে তিন থেকে ছয় বার বিদ্যুত্ গিয়ে সরবরাহ থাকে না তিন-পাঁচ ঘণ্টা। পিক আওয়ারে উত্পাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩৮ শতাংশই ঢাকায় সরবরাহ করা হয়। ফলে অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ কমে যায়।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘বেশি দামের আশায় অকটেন সরবরাহ কমিয়েছে প্রাইভেট রিফাইনারি’। খবরে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে একের পর এক জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ নোঙর করছে, আবার তেল খালাস করে ফেরতও যাচ্ছে। বেসরকারি রিফাইনারিগুলোতেও পেট্রল-অকটেন রাখার মতো স্টোরেজ ট্যাংক খালি নেই। কিন্তু জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখনো বহাল। ফলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- এত তেল যাচ্ছে কোথায়? তেল বিপণন কোম্পানিগুলো বলছে সরবরাহে কোনো সঙ্কট নেই, অথচ পাম্প মালিকদের দাবি, আগে কখনো এত পরিমাণ তেল তারা বিক্রি করেননি।

একটি সূত্র দাবি করেছে, মার্চ মাসে বেসরকারি রিফাইনারির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পেয়ে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হয়েছে। বাড়তি রেটের আশায় বেসরকারি রিফাইনারিগুলো গত মাসে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিপিসিকে পেট্রল ও অকটেন সরবরাহ না দেয়ায় এক ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, যা বাজারে সঙ্কটকে তীব্র করে তুলেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, এক দিকে চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজের ভিড়, অন্য দিকে সরকার পাম্পগুলোতে সরবরাহ ২০% বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তা সত্ত্বেও পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন কমছে না। একাধিক পাম্প মালিক জানান, গত বছরের তুলনায় ৩০% পর্যন্ত সরবরাহ কম দেয়া হচ্ছে। তারা আরো জানান, ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করছে। মোটরবাইক চালকরা দিনে কয়েকবার তেল নিচ্ছেন এবং ৫-৬ লিটার নেয়ার গাড়িগুলো এখন ২০ লিটার করে তেল নিচ্ছে। পাম্প মালিকদের মতে, সরকার রেশনিংয়ের ঘোষণাটা না দিলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

সরবরাহ ও মজুদের প্রকৃত চিত্র

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬৮.৩৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে ডিজেল ৬২.৬৯% এবং অকটেন ৫.৯০%। বর্তমান পরিস্থিতি নিম্নরূপ :

ডিজেল: চলতি মাসে চাহিদা ৪ লাখ টন। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত মজুদ ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ টন এবং খালাসের অপেক্ষায় আছে ১ লাখ ৬৪ হাজার টন।

অকটেন: মাসিক চাহিদা ৪৭ হাজার টন। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত মজুদ ছিল ২৭ হাজার ৬০২ টন। গত মঙ্গলবার নতুন জাহাজে আরো ২৭ হাজার টন অকটেন খালাস হয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি রফাইনারিগুলোর মজুদ এখনো হিসাবের বাইরে।

বণিক বার্তা

‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে—৫৭টি সরকারি ও ১১৬টি বেসরকারি।

তবে বর্তমানে ১৬৩টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। এর মধ্যে ৩৫টি পাবলিক ও ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল অনুষদ রয়েছে।

এত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশল শিক্ষা চালু থাকলেও আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের উপস্থিতি খুবই সীমিত। বৈশ্বিক বিভিন্ন র‌্যাংকিং বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে দেশের মাত্র ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিতে পেরেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষা খাতে কম বরাদ্দ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে পর্যাপ্ত গুরুত্বের অভাব এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ঘাটতির কারণেই মূলত দেশের প্রকৌশলবিদ্যায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা ‘কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস’ (কিউএস) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০২৬-এ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তালিকাভুক্ত ১৯১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান যথাক্রমে ১০০ ও ১২৬। এ র‌্যাংকিং নির্ধারণে মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে—চাকরিদাতাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা (এমপ্লয়াবিলিটি), গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক।

বর্তমানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শুধু প্রকৌশলবিদ্যার জন্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান পাঁচটি। এছাড়া বিগত দুই দশক ধরে প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমানে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩টিই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া অন্যান্য সাধারণ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে প্রকৌশল অনুষদ। ইউজিসির প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে প্রকৌশল শিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারের বেশি এবং বছরে প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েট তৈরি হন ৫০ হাজারের কাছাকাছি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এর বড় অংশই প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সংকটে ভুগছে। বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চারটির স্থায়ী ক্যাম্পাসই নেই, নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত ল্যাব এবং আটটিতে অধ্যাপক সংকট।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের প্রকৌশল শিক্ষা মূলত একাডেমিকভাবে দক্ষতা তৈরিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু একটি আইডিয়াকে মার্কেটাইজ করা বা প্যাটেন্টেবল পণ্যে রূপান্তরের যে “প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট” সংস্কৃতি আইআইটি বা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় রয়েছে, তা আমাদের এখানে অনুপস্থিত। ইনোভেশন ও প্যাটেন্ট সংস্কৃতির অভাবে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।’

দেশের শিক্ষার্থীরা একটি যন্ত্র পরিচালনা করতে শেখে কিন্তু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হয় কীভাবে সেটি শেখার সুযোগ সেভাবে পায় না জানিয়ে ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়গুলো পড়ানোর কথা ছিল কিন্তু এখন বেশির ভাগই ঢালাওভাবে সাধারণ বিষয় (জেনারেল সাবজেক্ট) যুক্ত করায় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিশেষত্ব হারাচ্ছে। আবার সীমিত বাজেটে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে “এমপ্লয়ার রেটিং” ও “ইন্ডাস্ট্রি কানেক্টিভিটি”তে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ হলো ল্যাবরেটরিগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে না পারা। সেই সঙ্গে গবেষণায় নামমাত্র বরাদ্দ। আমরা যদি আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের বৈশ্বিক সিইও বা পরিচালনা লেভেলে দেখতে চাই তবে শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব, উপযুক্ত গবেষণার পরিবেশ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন বাড়াতে হবে।’

কিউএস র‍্যাংকিংয়ের এমপ্লয়ার রেটিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ র‍্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর যথাক্রমে যথাক্রমে ৬০ এবং ৫৭ দশমিক ৪। অন্যদিকে এ তালিকায় স্থান পাওয়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর ৬৪-এর বেশি, পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর ৫০-এর বেশি এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর ৮০-এর বেশি।

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘বিদ্যুৎ পরিস্থিতি: লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার মধ্যে বাড়তি বিলের ভয়’। খবরে বলা হয়, গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ খাতে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। দিনে-রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।


এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে সরকারের তোড়জোড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে অস্বস্তিকর লোডশেডিং, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা—দুই সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বলছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে জীবন- যাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়লে নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব পড়বে। একদিকে গরমের কষ্ট, অন্যদিকে বিদ্যুৎ-সংকট—সব মিলিয়ে জনজীবনে তৈরি হয়েছে চাপা ক্ষোভ ও উদ্বেগ।

রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন আর আগের মতো স্থিতিশীল নেই। মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় দিনে ৩ থেকে ৫ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও ২০-৩০ মিনিট, কোথাও আবার এক ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদ, খুলশী, বায়েজিদ ও হালিশহর এলাকায় একই চিত্র। সন্ধ্যার পর থেকে লোডশেডিং বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক এলাকায় দোকানপাট ও অফিস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। খুলনায় সোনাডাঙ্গা, ময়লাপোতা ও নিউমার্কেট এলাকায়ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী, টঙ্গী ও শ্রীপুরে বিদ্যুৎ-সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, অনেক কারখানা জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে।

মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও নাজুক। মুন্সিগঞ্জ শহরে দিনে ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। মানিকগঞ্জে সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ফরিদপুরের সালথা, বোয়ালমারী ও নগরকান্দা উপজেলায় গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সালথার এক কৃষক বলেন, ‘বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে নদীভাঙন এলাকার গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। মাদারীপুরের শিবচর এলাকায় ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও লালমনিরহাটে লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। রংপুর শহরে দিনে ৫-৬ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। দিনাজপুরের বিরামপুর, ফুলবাড়ী ও পার্বতীপুর এলাকায় ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের গ্রামাঞ্চলে বোরো ধানের সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করছেন, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানা ও শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পঞ্চগড়ের বোদা ও দেবীগঞ্জ এলাকায় ছোট ব্যবসাগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে।

বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে উপকূলীয় এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বরিশাল নগরীতে দিনে ৪-৬ বার লোডশেডিং হচ্ছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা এলাকায় ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভোলায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। ঝালকাঠির নলছিটি ও কাঠালিয়া উপজেলায় রাতে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুর এলাকায় মৎস্য খামার ও হ্যাচারিগুলোতে বিদ্যুৎ-সংকটে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর

‘এবারও কৃষকের মাথায় হাত’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় শুরু হয়েছে ধান কাটার উৎসব। তবে কষ্টের এই ফসল ঘরে তুলতে কৃষকের মনে যে আনন্দ তা নিমেষেই মলিন হয়ে যাচ্ছে বাজারে গিয়ে। কারণ কৃষকরা ধানের ভালো দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচের চেয়েও কমে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ গত কয়েক মৌসুম ধরেই সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার কিনে, জ¦ালানি তেলের সংকটের মধ্যেও বাড়তি খরচে সেচ ঠিক রেখে, ধার করে টাকা নিয়ে দেশের উৎপাদন পরিস্থিতি ঠিক রাখতে কাজ করছেন সারা দেশের কৃষকরা।

নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় পুরোদমে ধান কাটা চলছে। এসব অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকাভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। তবে এই ধানটা পুরোপুরি শুকনো নয়। একটু শুকিয়ে যেসব কৃষক বিক্রি করছেন তারা মণপ্রতি ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে এক কেজি ধানের উৎপাদন খরচ হিসাব করেছিল ৩২ দশমিক ৯৬ টাকা। যাতে এক মণ (৪০ কেজি হিসেবে) ধানের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৩১৮ টাকা। এবারও তারা খাদ্য মন্ত্রণালয়কে ধানের উৎপাদন খরচের একই রকম হিসাব দিয়েছে। যদিও সার ও সেচে কৃষককে এ মৌসুমে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে।

দেশ রূপান্তরের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জাকারিয়া আহমেদ হাওর অঞ্চলের কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাহিরপুর উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের কৃষক মোবারক মিয়া তাকে জানান, তিনি ১২ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করেছেন। ঋণ থাকায় কাটার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ॥ধান বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। তিনি প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ৯৫০ টাকায়।

এই কৃষক বলেন, ‘সারের দাম বেশি, সেচের দাম গতবারের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু আমি যে দামে বিক্রি করছি তাতে করে উৎপাদন খরচও উঠছে না। ব্যাপারীরা যেভাবে মাঠ থেকে ধান কিনছেন সেভাবে সরকার যদি ধান কিনত তাহলে আমি হয়তো ভালো দাম পেতাম। কিন্তু ঋণ থাকায় এই ধান আমাকে কাটার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, সেখানকার হাওরে ধান কাটা পুরোদমে শুরু হয়েছে। জমি থেকেই যারা ফসল বিক্রি করছেন তারা ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা মণ হিসেবে দাম পাচ্ছেন। কিন্তু যারা একটু প্রত্যন্ত গ্রামে রয়েছেন তারা দামটা আরও কম পাচ্ছেন। একই চিত্র দেখা গেছে কিশোরগঞ্জসহ অন্যান্য অঞ্চলেও। কৃষকরা বলছেন, ক্ষেত থেকে যত বেশি ধান উঠতে থাকবে দামও তত কমতে থাকবে।

হাওর অঞ্চলে ইতিমধ্যেই ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাটা হয়েছে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জের হাওরে। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জেও ১৫ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল থেকেই এসব জায়গায় ধান কাটা শুরু হয়েছে।

কৃষকের যখন এই পরিস্থিতি, তখন আজ সকালে আধা ডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলে বৈঠকে বসবেন। সঙ্গে থাকবেন মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব, বিভিন্ন সংস্থার প্রধান ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি’র (এফপিএমসি) এই সভায় নির্ধারণ হবে এবারের বোরো মৌসুম থেকে কতটুকু ধান ও চাল কিনবে সরকার। একই সঙ্গে ঘোষণা আসবে সরকার কত টাকায় ধান ও চাল কিনবে। তবে এটা শুধুমাত্র সীমিত কেনাকাটার পরিকল্পনা। সেখানেও প্রকৃত কৃষকরা সুবিধাভোগী হন কি না তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘অপারেশনের অপেক্ষায় ৩০০ রোগী’। খবরে বলা হয়, হাতে বহির্বিভাগের টিকিট নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে দাঁড়িয়ে আছেন নাটোরের সুমন হোসেন। সুমন বলেন, ভাইয়ের ব্রেন টিউমার জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করা প্রয়োজন। আগারগাঁও নিউরোসায়েন্সস হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে শয্যা ফাঁকা না থাকায় ভর্তি নেয়নি, ঢাকা মেডিকেলে রেফার্ড করে দিয়েছে। এখানেও শয্যা ফাঁকা নেই। মেঝেতে রেখে হলেও তবু চিকিৎসা তো হবে এই আশায় দাঁড়িয়ে আছি। ভাই চোখে ঝাপসা দেখছে মাঝে মাঝে মানুষ চিনতে পারছে না।

নিউরোসার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মো. আশিক এহসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই বিভাগের ৩০০ শয্যায় বর্তমানে ৬২০ জন ভর্তি আছেন। চারটি অপারেশন থিয়েটারে ২৪ ঘণ্টা অপারেশন চলছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই বিভাগের ৭ হাজার সাতজন রোগীর অপারেশন করা হয়েছে। চিকিৎসক, রেসিডেন্ট চিকিৎসক, ইন্টার্নরা দিনরাত সেবা দিলেও এখনো অপারেশনের অপেক্ষায় আছে ৩০০-এর বেশি রোগী। অনেক সময় দেড় মাস-দুই মাস লেগে যায় সিরিয়াল আসতে। অপারেশন থিয়েটারের সংখ্যা বেশি হলে রোগীদের এত অপেক্ষা করতে হতো না।’

সুমন হোসেন যখন লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তখন অপারেশনের অপেক্ষমাণ তালিকা ৩০০ ছাড়িয়েছে। তাহলে সিরিয়াল আসতে আসতে ব্রেন টিউমারের মুমূর্ষু রোগীর অবস্থা কী হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজনদের কপালে ভাঁজ। দেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ভর্তি মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১১ হাজার রোগী সেবা নেয়। ২ হাজার ৬০০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি থাকে ৪ হাজার রোগী।

সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের ওয়ার্ড ছাপিয়ে বারান্দা, মেঝে, করিডর, র‌্যাম্প সব জায়গায় রোগী। জরুরি বিভাগের ভিতরে র‌্যাম্পে ঢালু জায়গাতে সারিসারি শুয়ে আছে রোগী। কেউ নারী, কেউ শিশু, কেউ বৃদ্ধ। পাশের লোহার গ্রিল কাজ করছে স্যালাইন স্ট্যান্ড হিসেবে। সেখানেই হাতে ক্যানুলা লাগিয়ে ইনজেকশন দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। আলো বাতাস পৌঁছায় না এই জায়গায়। ভ্যাপসা গরমে শ্বাস নেওয়াই কঠিন। বাড়ি থেকে ছোট ফ্যান নিয়ে এসেছেন রোগীর স্বজনরা। টাঙ্গাইলের সোবহান প্রামাণিক (৬০) কাঁধে টিউমার নিয়ে দেড় মাস ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। এরপর অপারেশন হয়েছেন। ব্যান্ডেজ চুইয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে কাঁথা ভিজে গেছে অনেকটা। এই রোগীর পাশ দিয়ে জুতা, স্যান্ডেল পায়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ। পাশে ভাত খেয়ে কুলি করছে আরেক রোগীর স্বজন। ফলে বাড়ছে ইনফেকশনের ঝুঁকি। মাতুয়াইলে বাসার পাশের মাঠে ক্রিকেট খেলছিল সিয়াম (১২)। গায়ে বল লাগাকে কেন্দ্র করে সিয়ামের মাথায় ব্যাট দিয়ে আঘাত করে আরেকজন। সিয়ামের মা আমেনা বেগম বলেন, আঘাতে মাথায় রক্ত জমাট বেঁধে ফুলে যায়। ছেলেকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে আনলে মাথায় ছোট একটা অপারেশন করেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই কিন্তু হাসপাতাল থেকে মাত্র দুটা ইনজেকশন দিয়েছে। অপারেশনে এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ইনজেকশন অন্যান্য সামগ্রী আমাদের কিনতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল হলেও ওষুধ নিয়মিত কিনতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই হাসপাতালে রোগী এলে কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। কারণ শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে রোগীরা এখানে আসে। রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ৭০০ চিকিৎসক, রেসিডেন্ট, ইন্টার্ন, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রয়েছেন। কিন্তু অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকট থাকায় ৪৭টি অপারেশন থিয়েটার দুই শিফটে চালু করা যাচ্ছে না। মাত্র ৫৫ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট রয়েছে হাসপাতালে। এজন্য রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অপারেশন করা হয় তবুও অনেক সময় এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দালালের দৌরাত্ম্য আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সবাইকে আইসিইউ বা সব ধরনের পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না হলে দালাল চক্র পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই দালালরা রোগীদের বাইরে নিয়ে যায়। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আনসার ও আমাদের নিজস্ব স্টাফদের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। নিয়মিত বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে।’

সিরু

১ মাস আগে

> বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে, কিন্ত
> জঙ্গি রাজাকার গুপ্ত রাজাকার আর জুলাই বাটপারদের প্রতিষ্ঠিত করার জুলাই সোদন প্রতিহত করা হবে।

মন্তব্য করুন